পরিচ্ছন্নতার ব্যারাম

১।
আমার পরিচ্ছনতার ব্যারাম আছে বলে মনে হয়। তবে সেটা শুচিবায়ুগ্রস্থতার পর্যায়ে পৌছেছে বলে মনে হয় না। কারণ .....  লিমিট টানতে পারি, ধূলাবালি ভরা কীবোর্ডেও টাইপ করে যাচ্ছি, কিন্তু সচেতনতায় ধূলাবালির কথাটা বিস্মৃত হচ্ছে না। বাসে, সিএনজিতে ময়লা সিটে ভ্রমন করতে পারি, ড্রেনের উপরের সালাদিয়া হোটেলের পাশে দাঁড়িয়ে চা খেতে পারি।
পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যে আমি খুব খুঁতখুঁতে ছিলাম তা কিন্তু নয়। ছোট বেলায় নিয়মিত মায়ের বকুনি বরাদ্দ ছিল নিজের কাপড় চোপড় ধোয়ার জায়গায় না দেয়ার জন্য। আমাদের বাসার মেঝে এমন ডলা দিয়ে মোছা হত যে কয়েকদিনের মধ্যেই সেটা চকচকে মসৃন প্রতিফলক হয়ে যেত। নিয়ম করে প্রতিটা জানালার ধুলা মুছতেন মা। তবে ইদানিং বয়স হয়ে যাওয়াতে এই পরিচ্ছন্নতায় উনি অনেক ছাড় দিয়েছেন, বা দিতে বাধ্য হয়েছেন। মাঝে মাঝে মা'র বাসায় গিয়ে চারিদিকের ধূলা ধুসরিত ময়লা জিনিষপত্র দেখে আমিই শিউরে উঠি। ন্যাকড়া ভিজিয়ে ডলাডলি করে কিছু ফার্নিচারের চেহারা পরিবর্তন করেছি। তবে আম্মার পরিচ্ছন্নতাগ্রস্থতার একটা ব্যাপারে এখনও দুইয়ে দুইয়ে চার মেলেনি --- একবার চেস্ট অব ড্রয়ার থেকে একটা ধোয়া শার্ট বের করে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম, ওটা পরে বাইরে যাব বলে। এর মাঝে কোন এক ফাঁকে আম্মা এসে ওটাকে ধুতে নিয়ে গিয়েছিলেন!! এর পর মা'কে অনেকবারই বলেছি, আমার গায়ের বোটকা গন্ধ, ময়লা কুতকুতে ভাব এসব আসলে কথার কথা, পুরাপুরি সত্য না -- এসব কারণের আপনি কাপড় ধুতে নিয়ে গেলে ঐ শার্টটা নিয়ে গিয়েছিলেন কোন হিসাবে? ওটাতে তো গন্ধ ছিল না।

২।
যা হোক, পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে জাপানের অভিজ্ঞতা আমাকেও অনেক বেশি খুঁতখুঁতে করে তুলেছে এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নাই। ওখানকার পিচ্চিগুলো নিজেদের পরিচয় দেয়ার সময় বলতো "ভাল ভাবে পরিচ্ছন্ন করতে চায়" -- সোউজি গাম্বারিমাস; কিংবা গামবাত্তে সোওজি শিমাস্  (গাম্বারিমাস্ বা গামবাত্তে অর্থ হল বেস্ট অব লাক; আর সোউজি কিংবা সোউজি শিমাস মানে হল ময়লা পরিষ্কার করা)। ঘটনা কী, খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, ডে-কেয়ার স্কুলে বাচ্চারাই তাঁদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করে -- এখানে আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত, এই ধোয়া মোছা করার সময় প্রচন্ড শীতকালেও গরম পানি ব্যবহার করেনা। এদিকে নাক দিয়ে তরল সর্দি পড়ছে, ওদিকে এজন্য বাবা-মা বাচ্চাদেরকে ঔষধ খাওয়াচ্ছে তবুও স্কুলে কিন্তু গরম পানি দেবে না: অবশ্য এটার পেছনেও যুক্তি অকাট্য -- এভাবে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করিয়ে করিয়ে বাচ্চাদের শরীরে রেজিস্টেন্স ডেভেলপ করাচ্ছে। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে ওদেরকে সত্যিকার অর্থেই ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে আর শক্তপোক্ত করেও গড়ে তুলছে -- আমরা তো খালি "পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ" বলেই খালাস।

৩।
জাপানে যেখানে থাকতাম সেখানকার একটা ব্যাপার যেটা আমাকে দারুন ধাক্কা দিয়েছিলো: সেটা হল জাপানের বুড়াদের ইভনিং ওয়াকের সময়ে ময়লা পরিস্কার করা দেখে। দৃশ্যগুলো ছিল এমন - একজন অবসরপ্রাপ্ত লোক বিকালে মাঠের চারপাশ দিয়ে আর পার্কে হাঁটছে। লোকটার হাতে মিষ্টির দোকানে মিষ্টি তোলার যে চিমটা আকৃতির চামচ থাকে সেরকম লম্বা একটা মেটাল চিমটা, আর আরেক হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ। হাঁটতে হাঁটতে যেই সামনে কোনো ময়লা কাগজ, চকলেটের বা আইসক্রিমের খোসা পাচ্ছে সেটা চিমটা দিয়ে নিয়ে সোজা ব্যাগে চালান করে দিচ্ছে। চিমটাটা লম্বা হওয়াতে এই কাজে তাকে ঝুঁকতে হচ্ছে না তেমন একটা। হাঁটাহাঁটির শেষ পর্যায়ে এই পলিথিনের ব্যাগটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে বাসার পথ ধরলেন। তাঁর এই সচেতন হাঁটাহাঁটিতে নিজের স্বাস্থ্যের উপকারের পাশাপাশি সমাজেরও উপকার হচ্ছে। কি সাংঘাতিক বুদ্ধি এদের: বুদ্ধিতে অবশ্য আমরাও কম না -- আমরা এখন হয়তো তাঁদের খুঁত ধরতে সেই বুদ্ধি ব্যবহার করবো।

আরেকটা জিনিষ ভীষন অবাক করেছিলো একটা পার্কে। একজন বৃদ্ধা মহিলা একটা চমৎকার ছোট কুকুরকে নিয়ে হাঁটছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করে দেখলাম উনি ওনার হ্যান্ডব্যাগের মত একটা কৌটা কুকুরের পেছনে ধরেছেন --- বুঝতে পারলাম সেটা কুকুরের পটি। ঘটনাটা যেখানে ঘটেছিলো সেটা ছিল একটা জঙ্গলের ভেতরের পায়ে চলা পথ। জঙ্গলটা শুকনা ঝরা পাইন পাতার পুরু কার্পেটের মোড়ানো ছিল। এখন বুঝতে পারলাম, এখানে কোন রকম ময়লাতে পাড়া না দিয়েই দৌড় দেয়া যাবে নিশ্চিন্তে। বিশেষত যেসব বাচ্চারা এটার মধ্যে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে তাঁদের এই সংক্রান্ত কোনো চিন্তা নাই --- এই ব্যাপারটা বাংলাদেশের জঙলা এলাকা দুরের কথা ফুটপাথেই চিন্তা করা যায় না!

৪।
আমি যেই বাসায় থাকতাম সেটা একটা ৫ তলা ভবন ছিল। এর পেছনের ডাস্টবিনটা আমাদের ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল। প্রতিটা ডাস্টবিনের বাইরে সেখানে কোন কোন ভবনের বাসিন্দাগণ ময়লা ফেলবে সেটার লিস্ট দেয়া থাকতো। আমার বাসার পেছনের ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতো ৪টা ভবনের ৪৮টা ফ্ল্যাটের লোকজন। ডাস্টবিনটা আসলে হাউজের মত একটা কংক্রিটের হাফ দেয়ালে ঘেরা ছোট ঘর। এর উপরে কাক বা বিড়াল যাতে ময়লা ছড়াতে না পারে সেজন্য নেট দেয়া। সামনে গেটে ছিটকিনি টাইপের লক। একদিন সকালে হঠাৎ আমার দরজার বাইরে একটা ফাইল আর লম্বা ডান্ডার মাথায় ব্রাশ দেখে বিল্ডিং-এর লিডারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে এটাতে ডাস্টবিনের সাথে থাকা কলের চাবি আছে। আগামী এক সপ্তাহ আমাকে ডাস্টবিনটা পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিটা ফ্লাটের লোকই এভাবে এক সপ্তাহ করে ডাস্টবিন পরিষ্কার রাখে -- এভাবে ৪৮ পরিবার ঘুরে প্রায় একবছর পর পর সকলের কাছেই দায়িত্ব আসে। সেখানে ময়লা ফেলার নিয়ম বেশ কড়া ছিল, তাই ওটা বাসযোগ্য ঘরের চেয়ে ময়লা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতোই না। সেই আলাপে এখন না যাই।

এ্যাপার্টমেন্ট এবং এর পেছনের ডাস্টবিন। কারা ময়লা ফেলতে পারবে, আর কোনদিন কোনধরণের ময়লা ফেলবে সেই সংক্রান্ত দুইটা নোটিশও দেয়া আছে।

এপার্টমেন্টরে চারপাশ নিজেদেরকেই পরিষ্কার করতে হত


এই এপার্টমেন্টেরই আরেকটা নিয়ম ছিল যে প্রতি মাসের প্রথম রবিবার (ছুটির দিন) সকালে আধাঘন্টা প্রতি পরিবার থেকে একজন  করে নামতে হবে চারপাশ পরিষ্কার করার জন্য। একটা কমন ফান্ড ছিল ঝাড়ু আর আনুসাঙ্গিক অন্য জিনিষপাতি যেমন, ময়লা ফেলার ব্যাগ, গাছ ছাটার যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কেনার জন্য। প্রতি মাসে সকালে মূলত প্রতিবেশিদের সাথে গল্পগুজব করতে করতে চারপাশ ঝাড়ু দিতাম, কেউ ঘাস এবং বেড়ার গাছগুলো কাটতো, তারপর সেগুলো জড়ো করে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে আসতাম। একবার নিজে উদ্যোগি হয়ে স্টর্ম সুয়ারের ড্রেনে জমা কয়েক বছরের বালু তুলে বাগানের মাটি বাড়ালাম। মাঝে মাঝে কিছু বুড়া বুড়ি ময়লা ফেলতে ভুল করতো, ফলে ময়লার গাড়িতে সেই ব্যাগ নিয়ে যেত না -- এই দিনে সকলে মিলে বসে বসে সেই ব্যাগগুলোর ময়লা বাছাবাছি করে নির্দিষ্ট প্রকৃতির ময়লা নির্দিষ্ট ব্যাগে আলাদা করে রাখতাম যেন পরেরবার এগুলো নিয়ে যায়।

নিজেরাই নিজেদের বাসার চারপাশ পরিষ্কার করা হত বলে সকলেই ময়লা না করার ব্যাপারে সচেতন থাকতো। বাচ্চারাও দেখতাম মা কিংবা বাবাকে এই কাজে উৎসবের মুডে সাহায্য করতে আসতো। ইউনিভার্সিটি এবং অফিসগুলোতেও এই পরিষ্কারের কর্মসূচী থাকতো বছরে দুই দিন। পূর্বঘোষিত সেই দিনে ইউনিভার্সিটির ভিসি/প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রফেসর, গবেষনা ক্লাসের ছাত্র সবাই লাইন ধরে সেই চিমটা আর ব্যাগ নিয়ে বাস্তবিকই চিরুনী অভিযান চালাতো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের এক মাথা থেকে আরেক মাথা। আমি দেখেছি যে এই অভিযানে তেমন ময়লা পাওয়া যেত না -- কারণ পরিষ্কার রাখার জন্য অনেক কর্মী থাকে। তারপরও দেখা যেত বিভিন্ন চিপা থেকে কেউ মাতাল টাতাল হয়ে ফেলে যাওয়া ক্যান বোতল ইত্যাদি বের হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল হাউজের কমন কিচেন-১

ইন্টারন্যাশনাল হাউজের কমন কিচেন-২

ইন্টারন্যাশনাল হাউজের কমন কিচেন-৩

ইন্টারন্যাশনাল হাউজের করিডোর। ডানে কিচেন আর বামে এর ঠিক বিপরীতে আমার রুম ছিল
৫।
দেশে ফিরেও সেই অভ্যাসটা বজায় রেখেছিলাম অনেক দিন। এখনও কিছুটা আছে। শুরুর দিকে নিজের অফিসরূম ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে ডলে মুছে ফেলতাম প্রতি দুইদিন পরপর। ফলে সেখানে কোন ধুলিকনা থাকতো না। এখন অবশ্য হয়তো মাসে একবার সব জানালা, কীবোর্ড, মনিটর, মেঝে নিজে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে ডলে মুছি। মাঝে মাঝেই সিড়িতে দুমড়ানো মোচড়ানো কাগজ দেখলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেই। এই কাজে কোনো লজ্জা নাই -- বরং ময়লা ছেড়ে দেয়াটাই লজ্জার মনে হয় আমার কাছে।

মাঝে মাঝে চোখের সামনে কলিগদের ময়লা ধুলা জমে কুতকুতে কীবোর্ড আর  মনিটর দেখে সহ্য করতে না পেরে ধরে মুছে দেই। একই কাজ করি বাসায় গিয়ে ছোটভাইয়ের কম্পিউটারেও (ওয়াক, এ্যাত ময়লা কীবোর্ড ধরে কীভাবে কে জানে)। আমার বাসায় বউয়েরও পরিষ্কার পরিচ্ছনতার রোগ আছে। তবে আমি যখন হাত লাগাই তখন ঐ জায়গাগুলো মুছি যেগুলো সকলেই সাধারণত এড়িয়ে যায়: টিউব লাইট, দেয়ালে ঝুলানো বাধাই ছবিগুলো, ফ্রিজের উপরদিক, দরজার কপাটের উপর, দেয়ালের স্কার্টিং, জানালার গ্রীল -- এগুলো সাধারনত কাজের লোকের সেন্সরে ধরা পড়ে না কখনই।

৬।
বছর দুই আগে একবার সকল ব্যাচমেট গেলাম ভালুকায় আনন্দ রিসর্টে নামে একটা পিকনিক স্পটে। সবাই বউ বাচ্চার কিচির মিচিরে দারুন অবস্থা। কিন্তু সেখানেও দেখি বাচ্চা বুড়া সকলেই যত্র তত্র ময়লা ফেলছে। লটারিতে পুরষ্কার পেল, প্যাকেট ছিড়ে সেখানেই মেঝে মাঠে ফেলে রাখছে। নিজে তুলে তুলে চারদিকে সুন্দর সব ডাস্টবিন ছিল সেখানে ফেলছিলাম প্রায় পাগলের মত। একবার মাইকে ঘোষককে দিয়ে বলিয়েও এলাম। কিন্তু রক্ত আর জিনে সভ্যতা কি আর একবেলাতে ঢুকে, সভ্যতা এবং সভ্য আচরণ আয়ত্ব করতে সময় লাগে।

গতবছর অনেকে একসাথে গেলাম মাওয়াতে পদ্মা সেতু'র সাইট দেখাতে। বাস বুকিং দিয়ে প্রায় ৪০ জনের টিম। খাওয়া দাওয়ার জন্য ছিল প্যাকেট লাঞ্চ। লাঞ্চ খেয়ে যথারীতি সকলেই যার যার ডিসপোজেবল বাটি বালুর প্রান্তরে এদিক সেদিক ফেলে মুহুর্তেই জায়গাটা ডাস্টবিন বানিয়ে ফেললো। আমি বাস থেকে নেমে কুড়াতে লাগলাম কয়েকটা করে মিলে একটা নেটের ব্যাগে ঢুকাচ্ছিলাম। বসকে এই কাজ করতে দেখে বাকীরাও সেই পথ ধরল অবশেষে। অবশ্য আমার চিন্তা ওখানে অমূলক ছিল, একটু পরেই টোকাই গ্রুপ এসে সব সাফ করে নিয়ে গেল।

৭।
ইদানিং প্রায়ই নিজেকে নিয়ে তাই চিন্তা হয়: শেষে মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে নাকি পরিষ্কার দেশের সন্ধানে ভাগতে হবে কে জানে!

দূষণ নিয়ন্ত্রণে দৌড়ের উপ্রে রাখা

ইদানিং দেখি আবার বড় বড় মশা বেশ জ্বালাচ্ছে অফিসে। অফিসের ক্লজেটে একটা এ্যারোসল আছে -- দিলাম ফুস্ ফুস্। এতে দেখি মশা মরে না, তবে দৌড়ের উপ্রে থাকে। দৌড়ের উপ্রে থাকে = হয়তো মাথা ঘুরে, বমি পায়, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে (তখন পাড়িয়ে মারা যায়) --- যাই লাগুক, মূল ব্যাপার হল ওষুধ দেয়া হলে ওরা আমাকে কামড়ানোর জন্য স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আসতে পারেনা। মশা না কামড়ানোটাই আসল উদ্দেশ্য, মারাটা নয় -- এছাড়া প্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন প্রাণীর দরকার আছে। এমনকি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টির জন্য ঐ রোগের দূর্বল জীবানু দিয়ে এন্টিবডিদের ট্রেনিং দেয়া হয়। কাকের উপদ্রব না থাকলে সানশেডে লাফিয়ে বেড়ানো ইঁদুর রয়ে যেত অনেক।

এবার পানিতে থাকা দূষকের কেতাবী সংজ্ঞা দেই: একটা পদার্থের নির্দিষ্ট মাত্রার উপস্থিতিতে পানির নির্দিষ্ট কোনো ব্যবহার যদি বাধাগ্রস্থ হয় তাহলে সেই ব্যবহারের জন্য সেই মাত্রাকে দূষণ বলে, এবং সেই পদার্থটিকে দূষক বলে। এই ধারণাটাকে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে -- ধরুন পানিতে আর্সেনিক আছে কিন্তু সেই পানি দিয়ে কাপড় কাঁচা হয়, সেই পানিতে সাঁতার কাটা হয় কিন্তু খাওয়া বা রান্নার কাজ হয় না -- তাহলে আর্সেনিক দূষক নয়। কারণ আর্সেনিকের কারণে কাপড় কাঁচা বা সাঁতার কাটা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে না। একই ভাবে পানির খরতা সাবান ক্ষয় বাড়িয়ে কাপড় কাঁচার ক্ষেত্রে দূষক, কিন্তু খাওয়ার ক্ষেত্রে নয় বরং ঐ খনিজ পদার্থগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। কাজেই মশা যদি জঙ্গলে থাকে, সুখে শান্তিতে বংশ বৃদ্ধি করে এবং আমার বাসায় এসে কানের কাছে গান না শোনায় এবং না কামড়ায় তাহলে সেটা সমস্যা নয়, দে আর নট শত্রুজ্। এমনকি মশা যদি ঘরে থাকে কিন্তু আমাকে না কামড়ায় কিংবা কানের কাছে গান না গায় তাহলেও এটাকে সমস্যা বলা ঠিক হবে না। ;-)

কোন বস্তু যদি দূষণ করে তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হল পলিউশন কন্ট্রোল বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম ধাপ কী?
প্রথম ধাপ হল গোয়েন্দাগিরি। অর্থাৎ দূষক ব্যাটা কখন কী করে, কৈ যায়, কোন দোকানে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুকে সব ডিটেইলস স্টাডি করতে হবে। ভালভাবে স্টাডি করলেই ঐ ব্যাটার সবচেয়ে দূর্বল পয়েন্টটা বের করা যাবে; কোন জায়গায় চিপি দিয়ে ধরলে বা আস্তে একটি টোকা দিলেই ব্যাটার দফারফা হবে সেটা বের করা যাবে। সবচেয়ে নাজুক সময়েই এটা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সুবিধা। এজন্যই দেখা যায় মশা থেকে রক্ষা পেতে এর বাসস্থান নষ্ট করি, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট করি আমরা -- এজন্য হাতে হাতে তালি বাজানো কাওয়ালী প্র্যাকটিস করি না। --- আর এই জ্ঞান এর জীবনচক্র গভীরভাবে বিশ্লেষন করেই এসেছে। খর পানির ম্যাগনেসিয়াম ব্যাটারে ধরাই যায় না, কিন্তু দেখা গেল উচ্চ pH এ এটা হাইড্রক্সাইড উৎপন্ন করে যার দ্রাব্যতা মারাত্নক কম --- এইবার পাইছি; আর ছাড়াছাড়ি নাই --- পানিতে ঢালো চুন, বাড়াও pH: মু হা হা এবার  ম্যাগনেসিয়াম বাবাজিকে দানা আকারে ফিল্টারে আটকিয়ে ফেলা যাচ্ছে -- এরপর একটু রিকার্বনেশন করলেই আবার পানি নিউট্রাল।

দূষণ নিয়ন্ত্রণের আরেকটা উপায় হল, দুষ্টুদেরকে দুষ্টামী না করতে দেয়া, অন্যভাবে ব্যস্ত রাখা। ওদেরকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখলেও দুষ্টামি করার পরিমান কমে যাবে। এটাকে দৌড়ের উপ্রে রাখা টেকনিক বলা যেতে পারে। যেমন
দুষ্টু লোককে বিয়ে দিয়ে দিলে এ্যাত কিছু সামলিয়ে বিড়ি ফুকে শিস বাজানোর টাইম পাবে না।
কিংবা, দুষ্টু খরতা পানিতে সাবান ক্ষয় করে ---  ও আচ্ছা সাবানের সোডিয়াম বিক্রিয়া করে! সাইক্লিক স্ট্রাকচারের সোডিয়াম দিলেই হয়, এর সব বাহু হাতে হাত ধরি ধরি করে ব্যস্ত তাই দুষ্টামিও কম।
আবার, পানিতে ফসফরাস এসে পচনশীল জলজ উদ্ভিদ বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফসফরাস ঠেকানো যাচ্ছে না --- ব্যাপার না ... ...  পানিতে এমন কেমিকেল দেয়া হোক যে ফসফরাস ওটার সাথে বিক্রিয়া করে এমন যৌগ গঠন করবে (এমন প্যাঁচে পড়বে) যে জলজ উদ্ভিদের ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকবে না।
আর্সেনিকের দুষ্টামি কমাতে এটাকে আবার মাটির আয়রনের সাথে সুখে শান্তিতে সংসার করাতে অর্থাৎ যৌগ গঠণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। যতক্ষণ আর্সেনিক আয়রনের সংসার ভেঙ্গে একা একা ঘুরাঘুরি করে ততক্ষনই বিপদ। (এই সংসার ভাঙ্গলো কেমতে সেটাই চিন্তার বিষয় -- কিছু তদন্ত রিপোর্ট বলে ডিশ কালচারের অনুপ্রবেশই এই ঘটনার জন্য দায়ী।)

ইদানিং লক্ষ্য করলাম রাজনীতিতেও বিজি রাখা তথা দৌড়ের উপ্রে রাখার এই টেকনিকটা খুব বহুল ব্যবহৃত।
এই প্রজন্মের দুষ্টু লুকজন জাতির ক্রিমিনালদের বিরূদ্ধে সজাগ, বিপদ ঘটাতে পারে? --- আচ্ছা ব্যাপার না ... ...  ব্লগে কিছু কাঁঠাল পাতা ভক্ষক ছেড়ে দাও, ওদের কাজ ম্যা ম্যা করা আর ল্যাদানো --ওগুলোকে তাড়াতে তাড়াতে ব্যস্ত থাকলে এদিকে পরিকল্পনা করে দুষ্টামি কিংবা একতাবদ্ধ হতে পারবে না। বেশ সফলভাবে এ্যাতদিন এই টেকনিকে কাজ চলছে। এখন উল্টাদিকেও পলিউশন কন্ট্রোলের জন্য একই টেকনিক খাটানো যেতে পারে, শুরুও হয়েছে এখন আস্তে আস্তে হিট বাড়াতে হবে।

দৈনন্দিন এবং খাবার উৎপাদনে ব্যবহৃত পানির পরিমান

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসারে শহরের কোন বাসায় (এপার্টমেন্ট) পানি সরবরাহ করতে হলে জনপ্রতি প্রতিদিন ২২৫ লিটার পানির চাহিদা ধরে নিয়ে মোট পানির চাহিদা হিসাব করতে হয়। তবে একটা শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নকশা করার সময়ে মোট জনসংখ্যাকে আরেকটু কম জনপ্রতি চাহিদা ধরে হিসাব করা হয়। সাধারণত এই চাহিদার মান ইউনিয়ন পরিষদে ৫০ লিটার/প্রতিদিন/প্রতিজন থেকে বড় শহরে ১৮০ লিটার/প্রতিদিন/প্রতিজন ধরে হিসাব করার পরামর্শ দেয়া হয় বিভিন্ন বইয়ে। বাংলাদেশে বিভিন্ন পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পে এই মানটি ১০০ লিটার/প্রতিদিন/প্রতিজন।

অর্থাৎ একটি এপার্টমেন্ট ভবনে ১০টি ফ্ল্যাট থাকলে সেখানে অন্ততপক্ষে ৬৫ জন (গার্ড, ড্রাইভার সহ) হিসেবে প্রতিদিন মোট ৬৫x২২৫=১৪,৬২৫ লিটার বা ১৪.৬২৫ ঘনমিটার পানি লাগবে ধরে নেয়া হয়। এই হিসেবে আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভারটি এর ২-৩ গুন বড় আর ছাদের ট্যাংকিটা এর ৬০% এর মত আকারের দেয়া হয়। নিচের ট্যাংকি বড় রাখার কারণ আপদকালীন সঞ্চয়, আর ছাদের ট্যাংকি ছোট রাখার কারণ এতে ছাদে কম ভার আসবে - আর ৬০% এর মত আকার দিলে দিনে দুইবার পাম্প চালালেই চলবে।

শহরের প্রতিটি বাসা অ্যাপার্টমেন্ট নয়, এতে নিম্নআয়ের মানুষের কম খরচের বাসস্থান যেমন রয়েছে তেমনি অত্যন্ত উচ্চআয়ের মানুষও বাস করে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরবরাহ কম (হয়ত কয়েকটা পরিবার মিলিয়ে একটা পানির কল), আর উচ্চ আয়ের জন্য অনেক বেশি পানি দেয়া হয় (গাড়ি ধোয়া, বাগানে  পানি দেয়া, বাথটাব ইত্যাদি)।

পানির চাহিদা বিভিন্ন কারণে কম বেশি হয়, যার মধ্যে আছে: ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতীক অবস্থা, আবহাওয়া (ঋতূ), ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার, পানির গুনগত মান, পানি সরবরাহ লাইনে পানির চাপ, পানি সরবরাহের প্রকৃতি (সবসময় থাকে নাকি মাঝে মাঝে আসে), পানি সরবরাহস্থল থেকে ব্যবহারকারীর দূরত্ব, বিকল্প পানির উৎস, পানির মিটারের উপস্থিতি, পানির দাম ইত্যাদি।

যা হোক এই মৌলিক চাহিদা পানি কিন্তু শুধুমাত্র বাসাতেই দরকার হয় তা নয়। আমাদের খাদ্য উৎপাদনে অনেক বেশি পানির প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন সেঁচ প্রকল্পে বাসগৃহে সরবরাহকৃত পানির চেয়ে অনেক বেশি পানির দরকার হয়, তবে সেখানে পানি পরিশোধনের প্রয়োজনীয়তা বাসগৃহের তুলনায় সীমিত। আজকে ডয়েচে ভেলে (জার্মান রেডিও)তে খাদ্য উৎপাদনে পানির পরিমানের উপর দারুন একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। সেটা সরাসরি শেয়ার করার উপায় পাইনি জন্য ওগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে একটা এনিমেশন বানিয়ে রাখলাম।
Deutsche Welle থেকে সংগৃহীত
[FYI: এনিমেশন তৈরীতে গিম্প ব্যবহার করা হয়েছে]

এই প্রসঙ্গে আরেকটা দারুন লেখা পাবেন এখানে: এক কাপ চায়ের মূল্য কত?