আসুন আমরা কৃপণ হই

লেখাটির ক্ষেত্র দুটি: বিদ্যূৎ সমস্যা আর, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (গ্লোবাল ওয়ার্মিং)। আসুন আমরা বিদ্যূৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্বতা সাধন করি। প্রথমে বলব কিভাবে, তারপরে কেন।

কিভাবে?

কয়েকভাবেই বিদ্যূৎ ব্যবহার কমাতে পারি আমরা। প্রথমত অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে: যেমন কোন রূম থেকে চলে যাওয়ার সময় শেষ ব্যক্তিটি সমস্ত বিদ্যূৎ ব্যবহারকারী যন্ত্র, যেগুলা আর কারো কাজে লাগছে না (লাইট, ফ্যান, এ.সি., ইলেকট্রিক হীটার, টিভি, কম্পিউটার, ক্ষেত্রবিশেষে শুধু কম্পিউটারের মনিটর ইত্যাদি) বন্ধ করে যেতে পারি। আগে ধারনা ছিল যে, বিদ্যূৎ বিলের কথা চিন্তা করে মোটামুটিভাবে বড়রা সবাই এ ব্যাপারটা জানেন এবং ছোটদের শিখান; তবে ইদানিং বুঝতে পেরেছি, আমার আদর্শগত এ ধারণা ভুল - তাই উল্ল্যেখ করলাম (চর্বিত চর্বন)।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বাভাবিক আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি (ডে-লাইট সেভিং) করতে পারি। অর্থাৎ, বিশেষত বৈদ্যূতিক আলোর ব্যবহার কমানোর জন্য ঘুমটা রাত্রেই সেরে রাখতে পারি। আমার এখানে বর্তমানে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত সরাসরি সূর্যালোক থাকে। আমি যদি আমার ঘুমের সময়টা রাত ২টা থেকে সকাল ৯টার বদলে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা করি তাহলে নিশ্চিতভাবেই ৩ ঘন্টার আলো জনিত বিদ্যূৎ খরচ কম হবে। অবশ্য পুরো দেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে টিভি চ্যানেলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন খুব বেশী; ওনারা যদি এ ব্যাপারে সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং ভালো ভালো অনুষ্ঠানগুলো বেশী রাত হওয়ার আগেই প্রচার করে পরে কম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচার করেন তাহলে অনেক লোকই বেশী রাত জাগার প্রয়োজন অনুভব করবেন না। এ ছাড়াও ক্ষেত্র বিশেষে দিনের বেলায় জানালার পর্দা সরিয়ে, কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন কমাতে পারি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ঘরের দেয়ালের রং; কারণ আলো প্রতিফলন করে এমন রং ঘরের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়। আর বিশেষ করে একতলা বাসার ক্ষেত্রে চারপাশের দেয়ালও সাদা রং করা উচিৎ - আমি একবার একটি বাসার রান্নাঘরের জানালার সামনের (জানালা থেকে মাত্র ২ ফুট সামনে) আলো বাধাদানকারী দেয়ালের অংশটুকু সাদা রং করিয়ে দেয়াতে দিনের বেলায় আর বাতি লাগতো না; বলাই বাহুল্য আগে ঐ দেয়ালটি ছিল (প্লাস্টারবিহীন) শ্যাওলা পড়া।

শক্তি সাশ্রয়ী (এনার্জি এফিশিয়েন্ট) যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সাশ্রয় করা যায় প্রচুর। বেশ কিছুদিন আগে (দেশে গিয়েছিলাম সে সময়ে), প্যাচানো সাদা কাচের নল দিয়ে তৈরী, কিন্তু বাল্বের মত আকারের একটা বাতি কিনেছিলাম - শক্তি খরচ মাত্র ৩০ ওয়াট, কিন্তু আলো দেয় ১২৫ ওয়াট বাল্বের সমান (এছাড়াও ৩, ৭, ১০, ১২, ১৫, ১৮, ২০, ২৩, ২৬ ওয়াটের বাতি দেখেছিলাম দোকানে); দামটা অবশ্য একটু বেশী: ৩০০ টাকা (!), যেখানে বাল্বের দাম ৩০ টাকার মধ্যে হত হয়ত। তবে সময়ের সাথে এই প্রযুক্তির দামও নাগালের মধ্যে চলে আসবে। কিন্তু বাতিটি জ্বালানোর পর আলোর শুভ্রতা দেখে বেশী দামের খেদটা মন থেকে চলে গিয়েছিল।

কেন?

সবার জানা উত্তর - ট্যাকের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। এজন্য বিদ্যূৎ মিতব্যয়িতার কথা বললেই বাসায় আমি হয়ে যাই কিপ্টা (কৃপণ)। কিন্তু তাছাড়াও আরো ব্যাপার জড়িত আছে সেখানে। অবশ্য এগুলোও অনেকের কাছে পুরান প্যাচাল মনে হতে পারে .... তবে সবার কাছে সেরকম হবে না, এই আশাতেই লিখছি। আমার জানামতে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার মত আমাদের দেশেরও বেশির ভাগ বিদ্যূৎ উৎপাদিত হয় ডিজেল পুড়িয়ে - যা একটি জীবাশ্ম জ্বালানী। সরকার এই আমদানীকৃত তেলের মূল্যের উপর একটা অংশ ভর্তূকী দেয়। কাজেই বিদ্যূতের মিতব্যয়িতায় ট্যাকের উপকার হচ্ছে দুই জায়গায় - ব্যক্তিগত এবং সরকারের।

অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে সরকারের ট্যাকের সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ কম, কারণ চাহিদার তুলনায় বিদ্যূৎ উৎপাদন অনেক কম। তবে আমাদের মিতব্যয়িতার কারণে সঞ্চিত সেই বিদ্যূৎ ব্যবহার করে হয়ত অন্য কেউ উপকৃত হবেন। যা হোক আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় অন্য ব্যাপারটি - সেটি হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ। কম বিদ্যূৎ খরচ মানে কম বিদ্যূৎ চাহিদা, অর্থাৎ কম বিদ্যূৎ উৎপাদন। আর কম উৎপাদন মানে কম জ্বালানী পোড়ানো। কম জ্বালানী পোড়ানো মানে, কম তাপ অপচয়, আর কম গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎপাদন, অর্থাৎ কম পরিবেশ দূষন এবং পৃথিবীর সার্বিক জীবাশ্ম-জ্বালানী মজুদের কম মাত্রায় ক্ষয়। কম তাপ ও গ্রীনহাউজ গ্যাস নি:সরনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলার মাত্রা একটু কমবে .... .... আমরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আমাদের সমুদ্রে ডোবা আরো কিছুদিন দেরী করিয়ে দিতে পারব।

সংক্ষেপে বললে এই দাড়ায় যে, দেশে বিদ্যূৎ মিতব্যয়িতায় আমাদের অর্থ সাশ্রয় হবে এবং বঞ্চিতগণ বিদ্যূৎ পাবে। আর, বিদ্যূতে স্বয়ংসম্পুর্ন দেশে মিতব্যয়িতার ফলে, অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা পাবে।প্রিয় মাতৃভুমির জন্য ক্ষতিকর এমন একটি ঝুঁকি (ডুবে যাওয়ার) কমানোর জন্য কৃপণ অপবাদ মাথায় নিতে আমার কোন আপত্তি নাই।

কমোড নামা

(পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিলো)

ফুকুওকা এয়ারপোর্টটা আমার খুব পছন্দ। কারণ একটাই: গরম পানিওয়ালা গরম কমোড। ঢাকা থেকে মিয়াজাকি আসার পথে ফুকুওকা-ই আমার জন্য জাপানের সুবিধাজনক গেটওয়ে। সাধারণত: ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর পড়ে ট্রানজিট হিসাবে। এয়ারপোর্টগুলো ঘুরাঘুরি করতে মন্দ লাগে না, কিন্তু সমস্যা একটাই - টয়লেট! স্প্রে গান ওয়ালা কমোড টয়লেট নাই; টিস্যূ পেপারে কাম সারতে পারি না কিছুতেই - দুই একবার ট্রাই করে ক্ষান্ত দিছি। পানির বোতল নিয়ে ঢুকি, কিন্তু বদনার কাম কি আর বোতলে হয়!

ফুকুওকা এয়ারপোর্টে পৌছে প্রতিবারই হাফ্ ছেড়ে বাঁচি। ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরে নিষ্ক্রান্ত হতে অনিচ্ছুক বর্জ্য, এয়ারপোর্টে করা পূর্বরাত্রের ডিনারের বর্জ্যঅংশ সানন্দে দেহত্যাগ (!) করে, আর প্লেনের ব্রেকফাস্টকে প্রসেসিংএর জায়গা করে দেয়। এই কমোডগুলোর রীম থাকে আরামদায়ক ভাবে উষ্ঞ, আর পরিষ্কারের সময় হাতের ব্যবহার সুইচ টিপার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও চলে। খালি একটু নড়াচড়া করে গরম পানির স্প্রে জায়গামত ফেলতে পারলেই হল। স্প্রে'র জোড় কমানো বাড়ানো যায়, কাজেই শরীরে লেগে থাকা ইয়ের স্টিকিনেস কোন সমস্যাই না!

বাসার কমোডের কথা চিন্তা করলেও খারাপ লাগে। একে তো পানির ব্যাবস্থা নাই - তার উপর এই শীতের (-৩ থেকে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস) সকালগুলোতে ঠান্ডা রীমের উপর বসলে ঠান্ডা-ছ্যাঁকা লাগে। পানির জন্য বালতি-বদনা, আর ঠান্ডার ছ্যাঁকা ঠেকানোর জন্য রীমের উপর রীম-কভার (মোজা-র মত)।

ইউনিভার্সিটির মধ্যে সব প্যান, কোন কমোড নাই। তাই কখনো ইয়ে পেলেই দে বাসায় ছুট। আশেপাশে অবশ্য ভাল ঝোপ আছে - কিন্তু ঐখানে গেলে জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা হবে, তাছাড়া প্যান আর কি দোষ করল? না না .... ভুল বললাম, প্যানের দোষ আছেরে ভাই; এ প্যান সে প্যান নয়। জাপানের স্পেশাল প্যান বলে কথা। বসতে হয় উল্টা দিকে মুখ করে! কে জানে ওরা স্বাস্থ্যসচেতন জাতি তো, তাই হয়ত এ ব্যাবস্থা - নিজ বর্জ্য দর্শন করে ভিতরে সব ঠিক আছে কি না বোঝার চেষ্টা।

যা হউক, পত্রিকায় দেখলাম আরো উন্নত (ডেভেলপড) কমোড আসতেছে শীঘ্রই। এগুলোও গরম-রীম গরম-পানি ওয়ালা তবে একটুস খানি হাইটেক: এটাতে কম্পিউটার চিপ থাকবে। বাসায় ফিট করার পর মাসখানেক ধরে এটা ব্যবহারের স্ট্যাটিসটিকস রেকর্ড করে সেই অনুযায়ী পাওয়ার ইউজ অপটিমাইজ করবে। অর্থাৎ যে যে সময়ে বাসার লোকজন টয়লেট ব্যবহার করেন, তার আগে আগে অটোমেটিক ভাবে রীম ও পানির হীটার অন করবে - তাতে অযথা বিদ্যূৎ ব্যবহার বা অপচয় রোধ হবে।

এখানেই শেষ না: কমোড হবে ঘরের ডাক্তার। আরও পরে কমোডের রীমের মধ্যে মেটালিক সেন্সর থাকবে - এটা কিভাবে জানি উরুর চর্বি মেপে বডি-ফ্যাট নির্ধারন করবে আর প্রয়োজন অনুসারে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেবে (সম্ভবত: প্রিন্টেড আউটপুট)। এরও পরের পরিকল্পনা হচ্ছে প্যাথোলজিস্ট কমোড - বুঝতেই পারছেন স্টুল-ইউরিন পরীক্ষা করবে। তবে বাংলাদেশে এসব চাইলে আগে ২৪ ঘন্টা বিদ্যূৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।

ধৈর্য্য ধরে এতদুর পড়ার জন্য ধন্যবাদ।