বাংলাদেশে আর্সেনিক – পর্ব ৪ : আর্সেনিক মুক্ত পানি পাওয়ার উপায়

পূর্ববর্তী পর্বে আর্সেনিক ছড়ানোর উপর প্রচলিত মতবাদগুলো তুলে ধরেছিলাম। এবার আসি আর্সেনিকমুক্ত পানি পাওয়ার উপায়ের আলোচনায়। মূলত দুইভাবে আর্সেনিকমুক্ত পানি পাওয়া যেতে পারে। একটি হল বিকল্প উৎস ব্যবহার করে আর অপর উপায় হল আর্সেনিকযুক্ত পানি হতে কোন উপায়ে আর্সেনিক দুর করে।

বিকল্প উৎস:
এটি যে কোন দূষন থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়। শিরোনামেই বুঝা যাচ্ছে যে আমরা আর্সেনিক নাই এমন পানি ব্যবহার করতে পারি। আমেরিকার মত উন্নত এবং বড় দেশে কোন এলাকায় এরকম দূষন হলে তারা বিকল্প উৎস খুঁজে নেয়। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত ও বাস্তবতা ভিন্ন। বিকল্প উৎসগুলির সুবিধা ও অসুবিধার উপর নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:

১. ভু-পৃষ্ঠের পানি বা জলাধারের পানি (সারফেস ওয়াটার):

নদী, হাওর, বাওর, পুকুর ইত্যাদির পানিতে আর্সেনিক নাই। কিন্তু এগুলোতে বিভিন্নরকম রোগ জীবানু আছে। শোধন করে না খেলে, আর্সেনিকযুক্ত পানি খেয়ে মানুষ মারা যেতে প্রায় ১০ বছর লাগতে পারে, কিন্তু জীবানু আক্রান্ত হল ১০ দিনের কম সময়ে মৃত্যূ ঘটতে পারে। কাজেই জীবানু ও অন্যান্য ভাসমান ও দ্রবীভুত ময়লা পরিশোধন না করলে জলাশয়ের পানি পান করা যাবে না। বাংলাদেশ খাল-বিল হাওড়-বাওড়ের দেশ: পানির কোন অভাব নাই, কিন্তু নিরাপদ পানযোগ্য পানির অভাব প্রকট।

জলাশয়ের পানির ময়লা ও জীবানু দুর করার জন্য অতি সহজে পাথর ও বালুর দুই বা ততোধিক পর্যায়ের ফিল্টার বা ছাকনি বানিয়ে তার মধ্য দিয়ে পানি শোধন করে নেয়া যায়, যা ভাসমান ময়লা এবং জীবানু কার্যকর ভাবে দুর করতে পারে। শুনতে খুব আকর্ষনীয় আর সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সবসময় এটি সম্ভব নয়। কারণ এ ধরনের শোধনাগার পানির কোন রাসায়নিক দূষন দুর করতে পারে না। খাল বিল বা নদীর পানি সবক্ষেত্রে রাসায়নিক দূষন মুক্ত নয়। শহুরে এলাকার আশেপাশে নদী নালায় বিভিন্ন রকম শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এসে পানিকে দুষন করে যা এভাবে সহজ পদ্ধতিতে পরিশোধন করা সম্ভব নয়। আবার গ্রাম এলাকায় কৃষি জমি থেকে সার ও কীটনাশক এসে পড়ে বহমান জলাশয়গুলোতে, ফলে ঐ পানির সহজে পরিশোধনযোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

অপর যে উপায়টির কথা খুব বেশি শোনা যায় সেটি হল পুকুরের পানি শোধনের জন্য বালুর ফিল্টার বা ছাকনি (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার বা পি.এস.এফ.)। এটিও সেই একই জিনিস – সহজে জলাশয়ের পানি থেকে জীবানু ও দানাদার ময়লা দুরকরার ছাকনি। এটি বানানো এবং পরিচলন খুবই সহজ। কিন্তু সমস্যা হয় দুটি -- প্রথমত শীতকালে বা শুষ্ক মৌসুমে পুকুরের পানি এ্যাত কমে যায় যে তা শোধনের অযোগ্য হয়ে যায় অথবা পুকুর শুকিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত: পরিশোধন উপযোগী পুকুর পাওয়া খুবই কঠিন, কারণ বর্তমানে দৈনন্দিন আমিষ চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে প্রায় সমস্ত হাজা মজা পুকুরেই মাছ চাষ করা হয় আর এ জন্য পুকুরে সার বিশেষত ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয় যা পান করা ঠিক নয় আর এটাকে পি.এস.এফ. পরিশোধন করতে পারে না। ফলে এ ধরনের পুকুর সুপেয় পানির বিকল্প উৎস হতে পারে না। পি.এস.এফ. এর উপরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কিছু প্রকাশনা থাকতে পারে; তবে এ বিষয়ে পরবর্তীতে কিছুটা বিস্তারিত লেখার আশা রাখি।

চিত্র: এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়র্কের তত্বাবধানে নির্মিত পুটখালি পাইপে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। যশোরের বেনাপোলের কাছে পুটখালি গ্রামে অবস্থিত। পাশের হাওর থেকে পানি পরিশোধন করে ৩টি গ্রামে সরবরাহ করে। গ্রাহকগণ নির্মান খরচের কিছু অংশ এবং পরিচলন খরচ বহন করেছেন।

২. গভীর নলকূপ:

যে সকল স্থানে অগভীর ভূ-স্তরের পানিতে আর্সেনিক দূষন পাওয়া গেছে, সেসব স্থানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত আরেকটি বিকল্প উৎস হল ভুগর্ভস্থ গভীর স্তরের পানি। সারাদেশের প্রথমিক আর্সেনিক দূষন জরীপে গভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া যায় নি। তাই প্রাথমিকভাবে সরকারের তরফ থেকে আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু, আর্সেনিক দূষনের প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বীক গড়ন থেকে অনুমান করা যায় যে, গভীর স্তরেও আর্সেনিক দূষন অসম্ভব নয়। বিশেষত, যদি গভীর স্তর থেকে প্রচুর পানি উত্তোলন করা হয় তাহলে সেখানকার পানির চাপ কমে যাবে, ফলশ্রুতিতে উপরের বা অগভীর স্তরের দূষিত পানি গভীর স্তরে চলে আসবে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গভীর নলকূপের পানিতেও আর্সেনিক দূষন ঘটায় এ আশঙ্কা সত্য বলেই মনে হয়। তাই গভীর নলকূপ আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের জন্য কোন টেকসই সমাধান বলে প্রতীয়মান হয় না।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ততার কারণে অনেকস্থলে অগভীর স্তরের পানিতে আর্সেনিক না থাকলেও পান করার কাজে ব্যবহার করা যায় না।

৩. বৃষ্টির পানি

বৃষ্টির পানিকে প্রকৃতিক পানির সমস্ত উৎসের মধ্যে সবচেয়ে শুদ্ধ ধরা হয়। কিন্তু যদি বায়ুমন্ডলে প্রচুর ধুলো-বালি ও অন্যান্য দূষনের উৎস ভেসে বেড়ায় তাহলে এই ধারনা সঠিক হবে না। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু গবেষনামূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ইতিমধ্যে। নলকূপের মত এটারও সুবিধা হচ্ছে যে পানি আনতে দুরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নাই। কিন্তু অসুবিধা আছে বেশ অনেকগুলোঃ প্রথমত বর্ষাকাল ছাড়া এদেশে বৃষ্টিপাত হয়না বললেই চলে। নিদেনপক্ষে ৫ মাস এ থেকে পানি পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া, বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য সুন্দর টিনের চালের দরকার, যা অনেকেরই নেই। অবশ্য বড় পলিথিন বা তেরপল টাঙিয়ে বৃষ্টির পানি ধরার সমতল বানানো যায়। অপর একটি অসুবিধা হল, বৃষ্টি শুরুর প্রথমদিকের পানি ধরা যায় না, ঐ পানি দিয়ে জমে থাকা ময়লা ধুয়ে চলে যাবে, তাছাড়া প্রথম দিকের বৃষ্টির পানিও পরিষ্কার নয় (ময়লা, মাটি থাকে!!!)। তাই ব্যবহার যোগ্য পানি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের এবং বেশ ঘন বৃষ্টি প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল বৃষ্টির পানিকে ধরে রাখার জলাধার – একটি এন.জি.ও অবশ্য কম খরচে বড় মটকীর মত জলাধার বানানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। তবে এটা সহজলভ্য নয়, যে কোন লোকালয়ে সহজলভ্য পদ্ধতি হতে পারে কংক্রিট রিং (যা সাধারনত পাতকুয়া বা পায়খানার ট্যাংকে ব্যবহৃত হয়) দিয়ে জলাধার তৈরী করা। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে।

৪. পাতকুয়া

পাতকূয়া বা ইন্দারার পানিতে আর্সেনিক নাই বলে রটেছিল। পাতকুয়ার পানির উৎস আশেপাশের জলাশয় ও অগভীর ভূ-গর্ভস্থ স্তরের পানি যা চুইয়ে এতে এসে জমা হয়। কিন্তু যশোর অঞ্চলে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক নামক এন.জি.ও.-এর গবেষনামূলক প্রকল্পে দেখা গেছে পাতকুয়ার পানিতেও আর্সেনিক থাকা বিচিত্র কিছু না। যদিও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, যুক্তরাস্ট্রের একটি সংস্থার অনুদানে পরিচালিত প্রজেক্ট ওয়েল, পাতকুয়াকে আর্সেনিক দূষন সমাধানের খুব সম্ভাবনাময় উপায় বলে প্রচার করছে।

পরবর্তী পর্বে পানি থেকে আর্সেনিক দূরীকরণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব.....

0 টি মন্তব্য: