পারিবারিক ও পাড়া পর্যায়ে এ পদ্ধতিতে আর্সেনিক দুর করার যন্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছে। এটি সহযোজন-অধ:ক্ষেপন পদ্ধতিতে আর্সেনিক দুর করে। অধঃক্ষেপনের জন্য সহায়ক বস্তু হিসেবে আয়রন ক্লোরাইড নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। জানামতে এই রাসায়নিক পদার্থ সহজলভ্য নয়, কিন্তু কোন স্থানে ব্যাপকভাবে এই পদ্ধতিতে আর্সেনিক দূরীকরণ করতে মনস্থ করলে এটা বেশী পরিমানে যোগাড় করা তেমন কঠিন হবে না। যৌগটি লোহার একটি যৌগ এবং মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকারক অন্য কোন পদার্থ এতে নেই বলে এটা অ্যালুমিনা নামক অপর সহযোজক অপেক্ষা অনেক বেশি নিরাপদ। তাছাড়া বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ পানির অম্ল/ক্ষারীয় অবস্থায় এটি অ্যালুমিনা অপেক্ষা অধিক কার্যকরী।

এ পদ্ধতিতে আর্সেনিক দূরীকরণ যন্ত্রের পারিবারিক পর্যায়ের যন্ত্রটির রেখাচিত্র দেয়া হয়েছে। উপরের বালতিতে কল বন্ধ করে ২০ লিটার পানি ভরে তার মধ্যে পরিমানমত আয়রন ক্লোরাইড দিতে হবে। তারপর একটা বড় ঘুটনী বা নাড়ুনী (ভাত রান্নার সময় হাড়ির ভেতরে ঘুটা দেয়াতে ব্যবহৃত হয়) দিয়ে ভাল করে গুলিয়ে দিতে হবে এবং তারপর কয়েকবার ঘুরিয়ে নাড়তে হবে যেন বালতির ভেতরে পানি চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এ অবস্থায় কিছুক্ষন (২৫-৩০ মিনিট)রেখে দিলে, কেমিকেল পদার্থ থেকে পানিতে অদ্রবনীয় কণার মত বস্তু তৈরী হবে এবং এর গায়ে আর্সেনিক লেগে যাবে এবং বালতির তলায় থিতিয়ে জমা হবে। তখন বালতির কল খুলে দিলে, কলে লাগানো পাইপ দিয়ে পানি নিচের বালুর ফিল্টার যুক্ত বালতিতে পড়বে ফলে যদি বালতির তলা থেকে বা অন্য কোন উপায়ে উক্ত কেমিকেলের অধঃক্ষিপ্ত বস্তু চলে আসে তা বালুতে আটকে যাবে এবং বালুর ভেতর দিয়ে পরিষ্কার আর্সেনিক মুক্ত পানি নিচের কলে চলে আসবে। এ পদ্ধতিতে কেমিকেলের সাথে সামান্য ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়, যা পানিতে বা বালুতে যদি কোনক্রমে কোন জীবানু চলে আসে তাকে মেরে ফেলে। ভূ-গর্ভস্থ পানিতে থাকা লৌহ এ পদ্ধতিতে আর্সেনিক দূরীকরণ মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। গবেষণাগার ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে এটি খুবই কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।(তথ্যসূত্র: আমার স্নতোকোত্তর গবেষণাপত্র)

পাড়া পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্র আকারে অনেক বড় এবং এখানে রাসায়নিক পদার্থ মিশাতে অনেক বেশী শক্তির দরকার হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে ডানিডার যৌথ গবেষণামূলক প্রকল্পে ব্যবহৃত (ফিল এন্ড ড্র) যন্ত্রের ছবি দেয়া হয়েছে। ট্যাংকটিতে সাধারণত বৈদ্যূতিক পাম্পের সাহায্যে পানি ভরানো হয়। এরপর এতে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে ট্যাংকের ভেতরে ঘূর্ণনক্ষম পাখার মত নাড়ুনীর সাথে সরল গিয়ারচাকা দিয়ে যুক্ত হাতল ঘুরানো হয় এবং কিছুক্ষন পর থেকে পাশের ছোট ফিল্টার হাউজ থেকে পানি সংগ্রহ করা যায়।
এই পদ্ধতির অসুবিধা হল সহযোজী রাসায়নিক পদার্থ সহজলভ্য নয়। কোন স্থানে আর অন্য কোন উপায়ে আর্সেনিকমুক্ত পানি পাওয়া না গেলে, শেষ বিকল্প হিসেবে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. সহযোজন ফিল্টার
ক) সক্রিয় (অ্যাক্টিভেটেড) অ্যালুমিনা দিয়ে
পরিবার ও পাড়া পর্যায়ে ব্যবহারউপযোগী এটি একটি সহজবোধ্য ফিল্টার। যেখানে একটি সাদা গুড়া পদার্থের (অ্যাক্টিভেটেড অ্যালুমিনা) ভেতর দিয়ে পানি প্রবাহিত করিয়ে একে আর্সেনিকমুক্ত করা হয়।
আর্সেনিক ছাড়াও অন্যান্য পদার্থ শোষন করে এই ফিল্টারের কার্যক্ষমতা যেন দ্রুত নিঃশেষ না হয়ে যায়, সেজন্য এই ফিল্টারে পানি প্রবেশ করানোর পূর্বে প্রাক-পরিশোধন (প্রি-ট্রিটমেন্ট) করা হয়ে থাকে। এজন্য সাধারনত পানিকে বায়ুর সংস্পর্শে এনে এতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমান বাড়ানো হয়; এই অক্সিজেন পানিতে দ্রবীভুত লৌহ, ম্যাঙ্গানিজ প্রভৃতিকে অদ্রবনীয় যৌগে রূপান্তরিত করে এবং এই পানিকে সাধারণ বালুর ফিল্টারের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করিয়ে এগুলোকে দূর করা হয়। এই প্রাথমিক পরিশোধনের পর পানিকে মূল অ্যালুমিনার ফিল্টারের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করিয়ে আর্সেনিকমুক্ত করা হয়।
সাধারণত পর পর কয়েকটি মোটা পাইপ জাতীয় ধারকের মধ্যে এই ফিল্টার বানানো হয় এবং একপাশে চাপকলের সাথে সংযোগ দেয়া হয়। ব্যবহারকারীকে এর ভেতরে কি ঘটছে সেটা না ভেবে শুধু পানি চাপকল চেপে এর ভেতরে পানি প্রবেশ করিয়ে অপর প্রান্তের কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
এই পদ্ধতির মূল অসুবিধা হল ফিল্টারের কার্যক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে এটি পরিবর্তন/ পরিশোধন করা, যা যথেষ্ট সস্তা নয়, তাছাড়া সক্রিয় অ্যালুমিনা সহজলভ্য নয়, তবে সম্ভবত অ্যালুমিনা বা ফিটকিরি থেকে এটি স্থানীয় ভাবে প্রস্তুত করা যেতে পারে। অপর সমস্যা হল সহজে ফিল্টারের কার্যক্ষমতার মেয়াদ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা।
খ) জি.এফ.এইচ
এটি অ্যালুমিনার বদলে গ্রান্যুলার ফেরিক হাইডোক্সাইড ব্যবহার করে তৈরী করা হয়। বাকী সব একই রকম। এই পদার্থটিও এদেশে উৎপন্ন হয় না বলে সহজলভ্য কিংবা সস্তা নয়। ফিল্টারের কার্যক্ষমতার মেয়াদ নির্ধারণ করাটাও এক্ষেত্রে সহজ নয়।
গ) অ্যাক্টিভেটেড কার্বন বা সক্রিয় কয়লার ফিল্টার
এইটিও সক্রিয় অ্যালুমিনার মতই একটি ফিল্টার পদ্ধতি, শুধু সক্রিয় অ্যালুমিনার বদলে সক্রিয় কয়লা ব্যবহার করা হয়। সক্রিয় কয়লা স্থানীয় ভাবে সহজেই উৎপন্ন করা সম্ভব, তাই এটি অধিক সম্ভাবনাময়।
বেশ কিছু এন.জি.ও. এই পদ্ধতিতে বানিজ্যিক ভাবে পানি শোধন করছে বলে দেখেছি। গ্রাহকের সরবরাহকৃত পাত্রে (জেরিকেন) শোধনাগার থেকে পানি সংগ্রহ করে গ্রাহকের কাছে পৌছে দিয়ে প্রতি লিটার পানির জন্য প্রায় ০.৫০ টাকা নেয়া হয় বলে দেখেছি নোয়াখালীর সোনাপুর বাজারে! এটি বোতলজাত খনিজ পানির চেয়ে সস্তা।
(......চলবে)

0 টি মন্তব্য:
Post a Comment