পূর্ববর্তী পর্বে নদীবাহিত পলি যে বাংলাদেশ-এ আর্সেনিক-এর উৎস সেটার উপরে কিছুটা লিখেছিলাম। এ পর্বের বিষয় হলো, এই আর্সেনিক কেন এই এ্যাত বছর চমৎকার ভাবে ঘুমিয়ে থাকার পর মাটির ভেতর থেকে পানিতে দ্রবীভূত হয়ে আসছে? খনিজ যৌগের মধ্যে কি ই বা এমন ঘটল যে, আটকে থাকা আর্সেনিক সেখান থেকে পানিতে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল?
এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত আছে। প্রথম মতবাদটি দেন পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর দীপঙ্কর চক্রবর্তী। উনি এবং আমেরিকার ভূ-তাত্ত্বীক জরিপ দল (ইউ.এস.জি.এস) পশ্চিমবঙ্গে জরিপ করে বললেন যে বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে মাটিতে থাকা আর্সেনিক যৌগটি ভেঙ্গে যাচ্ছে আর পরবর্তীতে সেই ছুটে যাওয়া আর্সেনিক পানিতে মিশে যাচ্ছে।
উনার তত্ত্ব অনুসারে, বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা ভূগর্ভ থেকে প্রচুর পানি পাম্প করে তুলে আনছি, যার ফলে পানির স্তর আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আর পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়াতে, পূর্বে মাটির যে সকল স্তর সবসময় পানির মধ্যে ডুবে থাকতো সেগুলো আর ডুবে নেই; ফলে মাটির কণার ফাকে ফাকে, আগে যেখানে পানি ছিল সেখানে বাতাস প্রবেশ করছে। বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে যৌগগুলো জারিত (অক্সিডাইজড্) হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, ফলে পানিতে অদ্রবনীয় যৌগ থেকে ছুটে আর্সেনিক পানিতে দ্রবীভুত হয় এমন যৌগ গঠন করছে। পরবর্তী বর্ষার পরে আসা পানির সাথে মিশে গিয়ে তা ভূ-গর্ভস্থ পানির সাথে গিয়ে মিশছে। এই মতবাদটাকে জারন তত্ত্ব (অক্সিডেশন থিয়রি) বলা হয়।
বাংলাদেশে ব্রিটিশ ভূ-তাত্ত্বীক জরিপ দল (বি.জি.এস.) আর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডি.পি.এইচ.ই.) জরিপ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে জারন নয়, বরং বিজারনের (রিডাকশন) ফলে মাটির আর্সেনিক পানিতে আসছে। এটাকে বিজারন তত্ত্ব (রিডাকশন থিওরি) বলা হয়। তাদের কারণটা হল, তাদের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলে দেখা যায় যে, আর্সেনিক আক্রান্ত স্তরের পানিতে জারন-বিজারন ঘটার সম্ভাবনাসূচক বিভব (অক্সিডেশন রিডাকশন পোটেনশিয়াল = ও.আর.পি.) ঋণাত্নক মানের (নেগেটিভ), যা বিজারন ঘটার সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, রাসায়নিক ভাবে জারন বা বিজারন যে কোন প্রক্রিয়ায়ই মাটির অদ্রবণীয় খনিজ আর্সেনিক থেকে দ্রবণীয় আর্সেনিক যৌগ পাওয়া সম্ভব। তাই পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিজারন নির্দেশ করলেও জারন তত্ত্বের ব্যাখ্যা সহজেই উড়িয়ে দেয়া যায়না। জারন তত্ত্বে পরীক্ষালব্ধ ফলের অভাব রয়েছে আর বিজারন তত্ত্বে কিভাবে এতদিন পরে হঠাৎ করে এ অবস্থার উদ্ভব হয়েছে সে ব্যাপারে ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে।
পরস্পরবিরোধী এ দুটো মতবাদের পর ইদানিং যে মতবাদটি বেশ নাম করছে সেটাকে বলা হয় সবুজ বিপ্লব তত্ত্ব (গ্রীন রেভ্যূলুশন থিওরি)। এ তত্ত্ব অনুসারে, বিশেষত বাংলাদেশে যে সকল স্থানে উচ্চ ফলনশীল প্রজাতির ধান চাষ হয় বা অনেকদিন হতে হচ্ছে সেসব স্থানেই আর্সেনিক দূষনের মাত্রা বেশি। বলা হয় যে, উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করার জন্য প্রচুর পানি সেচ দিতে হয় যার অধিকাংশ আসে অগভীর নলকুপ থেকে; এতে যেমন জারন তত্ত্বের ব্যাখ্যার মত পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে, তেমনি উচ্চমাত্রার সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে, জমিতে থাকা অব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থগুলো (সার ও কীটনাশক) আস্তে আস্তে পানির সাথে চুইয়ে মাটির স্তরগুলোতে ঢুকে পড়ছে। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো মাটির খনিজের সাথে বিক্রিয়া করে তা থেকে আর্সেনিক মুক্ত করে ফেলছে। মুক্ত হওয়া আর্সেনিক পরবর্তীতে চুয়ানো পানির সাথে ভূ-গর্ভের পানিতে গিয়ে মিশছে।
ব্যক্তিগত ভাবে এ মতবাদটাকে আমার যথেষ্ট যুক্তিসম্পন্ন মনে হয় এই কারণে যে, ফসফরাস আর্সেনিকের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে। কারণ ফসফরাস ও আর্সেনিকের পরমানুর রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই; পরমানুগুলিকে ধর্ম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে যে পর্যায় সারনীতে সেখানেও ফসফরাস ও আর্সেনিক একই কলামে পরপর অবস্থান করে। বিক্রিয়া করার জন্য প্রয়োজনীয় চার্জ উভয়ের সমান কিন্তু ফসফরাস আকারে ছোট হওয়াতে এর চার্জ ঘনত্ব বেশী ফলে তা আর্সেনিকের চেয়ে রাসায়নিক ভাবে বেশি সক্রিয়। ফলে যে কোন যৌগ থেকে ফসফরাস অনায়াসে আর্সেনিককে প্রতিস্থাপন করে নিজে সেই স্থান দখল করতে পারে। ফলে খনিজমাটি হতে ফসফরাস যে আর্সেনিককে প্রতিস্থাপন করে দ্রবণীয় যৌগ গঠন করে, পরবর্তীতে পানিতে মিশে যেতে বাধ্য করে তা বেশ বোধগম্য একটা প্রক্রিয়া।
শুধু তাই নয়, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কোন কারণে (শিল্পকারখানার দূর্ঘটনা বা আর্সেনিক খনি)মাটিতে আর্সেনিক দূষন ঘটে সেখানে ঐ দূষিত মাটির ভেতর দিয়ে ফরফরাস যৌগযুক্ত পানি প্রবাহিত করে এটাকে আর্সেনিক মুক্ত করা হয়। অপরপক্ষে, আমাদের দেশে ধান চাষের জন্য ট্রিপল সুপার ফসফেট (টি.এস.পি) সার ব্যবহৃত হয়, আর এর ব্যবহার মাত্রা জাপানে চাষে ব্যবহারমাত্রার চেয়ে অনেক বেশী। টি.এস.পি. উদ্ভিদের ভাল ফলনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। কাজেই এ থেকে চুইয়ে যে ফসফরাস যৌগ মাটিতে ঢুকবে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
তবে এই মতবাদের দূর্বলতা হল, এটা নেপাল বা ভারতের কিছু অংশের দূষনকে ব্যাখা করতে পারে না। কারণ ঐ অঞ্চলগুলোতে কোন সবুজ বিপ্লব ঘটেনি!
আর্সেনিক ছড়ানোর মতবাদে সর্বশেষ সংযোজন জীবানু তত্ত্ব! এটাকে বিজারন তত্ত্বের পরিপুরক বলা যেতে পারে। কারণ এতে বলা হচ্ছে যে, মাটিতে চুইয়ে সার ঢোকার ফলে সেখানে জীবানু বেঁচে থাকার মত বস্তুর সমাহার ঘটেছে। জীবানুগুলো তাদের শ্বসন কাজে ব্যবহৃত অক্সিজেন বা চার্জ সংগ্রহ করছে আশেপাশের পরিবেশ থেকে, পানিতে দ্রবীভুত অন্যান্য যৌগ থেকে। যার ফলে ওখানে ঋণাত্নক জারন-বিজারন বিভব (নেগেটিভ ও.আর.পি.) সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করছে।
আজ আপাতত এ পর্যন্তই থাক। পরবর্তী পর্বে আর্সেনিক মুক্ত পানি পাওয়ার উপায়ের উপর লিখব।
---মিয়া মোহাম্মদ হুসাইনুজ্জামান (শামীম); ২৬-জানুয়ারী-২০০৭ইং---

0 টি মন্তব্য:
Post a Comment