পূর্ববর্তী পর্বে এই ধারাবাহিক লেখার শুরুতে আমার স্বীকারোক্তি দিয়েছি। এই পর্বের শুরুতে বলে রাখা ভাল যে, পৃথিবীপৃষ্ঠে স্বাভাবিক উপায়ে প্রাপ্ত খনিজগুলির মধ্যে প্রচুর্যতার দিক থেকে আর্সেনিক ১২তম। সমূদ্রের পানিতে ১৪তম আর মানুষের দেহে ১২ তম।
বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক যে মাটিতে থাকা খনিজ পদার্থ থেকে আসছে এ বিষয়ে এখন আর কারো দ্বীমত নেই। আগে অবশ্য পল্লী বিদ্যূতের খুটিতে সিজনিংএ ব্যবহৃত কেমিকেল থেকে মাটিতে আর্সেনিক এসেছে এরকম একটি মতবাদ চায়ের কাপে বেশ ঝড় তুলেছিল কিছুদিন। এ বিষয়ে তেমন কোন পরীক্ষালব্ধ ফলাফল দেখিনি কোথাও। বর্তমানে বিতর্কের বিষয় হচ্ছে কিভাবে মাটিতে থাকা খনিজ আর্সেনিক পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে? বা আগে ছড়ায়নি, ইদানিং কেন ছড়াচ্ছে? এই লেখার পরের পর্বে এই বিতর্কে যা যা বেরিয়ে এসেছে তার উপর আলোকপাত করব।
আর্সেনিকের ছড়িয়ে পড়ার মতবাদগুলো ব্যাখ্যা করার আগে, কেন “মাটি থেকে আর্সেনিক আসছে” এই মতবাদ সর্বজনগ্রাহ্য সেটা সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন। ভূ-তাত্ত্বীক জরীপ থেকে প্রাপ্ত মাটির নমুনা পরীক্ষা করে সন্দেহাতীত ভাবে মাটিতে আর্সেনিকের খনিজ থাকার ব্যাপারটা প্রমানিত হয়েছে। বৈদ্যূতিক খুটি থেকে কিছু আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়া অসম্ভব নয় কিন্তু সেটি কোনক্রমেই নেপাল, ভারত, বাংলাদেশের এ্যাত ব্যাপক আর্সেনিক দূষণের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। খনিজ মতবাদে বলা হয়ে থাকে হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত আর্সেনিকযুক্ত খনিজ পদার্থ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বড় বড় নদী বিশেষত গঙ্গা (পদ্মা) নদী দিয়ে পলির সাথে বাহিত হয়ে এসে আমাদের এই পাললিক ভুমি গঠন করেছে। এটা নিকট অতীতে (১০ হাজার বছর আগে থেকে) ঘটেছে। কারণ তৎপূর্বে গঠিত ভুমি, যথা বরেন্দ্র ভূমি বা পার্বত্য অঞ্চলে আর্সেনিক দূষণ পরিলক্ষিত হয় না; ঐসব এলাকার মাটির নমুনাতেও আর্সেনিকের উপস্থিতি তেমন লক্ষ্য করা যায় না। তাছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে (গত পাঁচ বছরে) নেপাল ও ভারতে পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, গঙ্গা নদীর উপনদীগুলির অববাহিকা অঞ্চলেই ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের দূষণ রয়েছে। বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ মানচিত্র দেখলেও নদীর সাথে আর্সেনিক দূষণের একটা সম্পর্ক চোখে পড়বে।
গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়াও, হিমালয় পর্বতমালা ও তিব্বত এলাকা হতে উৎপন্ন অন্য বেশ কিছু নদী অববাহিকায় ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের দূষণ দেখা যায়। উদাহরণঃ ভারতের আসাম প্রদেশে ব্রক্ষপুত্র নদীর অববাহিকায়; পাকিস্থানের সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশে সিন্ধু নদীর অববাহিকায়; ইরাবতী নদীর অববাহিকায় মিয়ানমারে (বার্মায়); কম্বোডিয়ায় মেকং নদী অববাহিকায়; ভিয়েতনামে হং নদী অববাহিকায়; চীনের ইনার-মঙ্গোলিয়া প্রদেশে হোয়াং হো নদী অববাহিকায়। এই গুলি সবই নদীবাহিত মাটির কণায় থাকা খনিজ আর্সেনিকের কারণে সৃষ্ট দূষণ বলে জানা গেছে। ইরানের পশ্চিমাংশে অবস্থিত কুর্দিস্থান প্রদেশেও মাটিতে অবস্থিত খনিজ হতে ভু-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণের কথা জানা গেছে। এসকল ছাড়াও অন্যান্য উপায়েও পৃথিবীর অনেক জায়গায় আর্সেনিকের দূষণ ঘটেছে (খনিজ আহরণ জনিত কারণে, আর্সেনিকযুক্ত কয়লা, কীটনাশক হতে, দূর্ঘটনাজনিত, ইত্যাদি) ।
এসকল তথ্য থেকেও এ ধারণা জোরদার হয় যে, হিমালয় পর্বতমালা গঠনকারী শিলার মধ্যে খনিজ আর্সেনিক ছিল বা আছে, যা বিভিন্ন প্রকৃতিক উপায়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নদীবাহিত পলির সাথে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষনায় দেখা গেছে যে, গঙ্গা ও যমুনা নদীর পানিতে, এই নদীবাহিত মাটির কণাতে এবং এই নদীবক্ষে অবস্থিত অতি সাম্প্রতিক অধঃক্ষেপে (এক বছরের মধ্যে) আর্সেনিক নেই বললেই চলে। কাজেই আমার অনুমান যে, ক্ষয় হওয়ার মত যথেষ্ট আর্সেনিক সমৃদ্ধ খনিজ এখন আর গঙ্গা ও ব্রক্ষপুত্র নদীর আর্সেনিকের উৎসের কাছে অবশিষ্ট নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যেটি না জানলেই নয় সেটা হলঃ বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের নদীবাহিত পাললিক ভূমির সব স্তরে কিন্তু আর্সেনিক পাওয়া যায়নি। ল্যাবরেটরীতে ভূ-তাত্ত্বীক জরীপের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, বালুস্তরে আর্সেনিক নাই বললেই চলে, কিন্তু কালো রঙের জৈব পদার্থযুক্ত মাটি (অর্গানিক সাবস্টেন্স যুক্ত মাটি, পীট) আর কাঁদামাটির (এঁটেল/পলি) স্তরে যথেষ্ট আর্সেনিক আছে।
পরবর্তী পর্বে মাটির বিভিন্ন স্তরের খনিজ আর্সেনিক কিভাবে পানিতে দ্রবীভূত হয়ে আসছে তার উপর মতবাদগুলি লিখব।
--- মিয়া মোহাম্মদ হুসাইনুজ্জামান (শামীম); ২২-জানুয়ারী-২০০৭ইং ---
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

0 টি মন্তব্য:
Post a Comment