আবর্জনা ব্যবস্থাপনা - পর্ব ০২

আবর্জনার গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট

আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য এর গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্টগুলো জানা থাকা জরুরী।

গাঠনিক বৈশিষ্ট

আবর্জনার গঠন সম্পর্কে জানার জন্য নিম্নলিখিত বৈশিষ্টগুলো জানতে হয়:
  • আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণ।
  • বর্জ্য-কণার আকার বিশ্লেষণ (Particle size)।
  • বর্জ্যের জলীয় অংশ (Moisture content)।
  • বর্জ্যের ঘনত্ব (Density)।

আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণ

এই বিশ্লেষণে যে সকল আলাদা রকমের উপাদান একত্রে মিশে আবর্জনা তৈরী হয়েছে সেগুলো চিহ্নিতকরণ এবং এগুলোর (শতকরা) অনুপাত নির্ণয়। এ ধরণের বিশ্লেষণ করার জন্য ডাস্টবিন/আবর্জনা ফেলার স্থান থেকে সদ্য ফেলা আবর্জনার নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে উপাদান অনুযায়ী ভাগ করা হয়, এবং প্রতিটা ভাগের ওজন ও আয়তন পরিমাপ করা হয়। নিচে এ ধরণের বিশ্লেষণের কিছু উপাত্ত দেয়া হল:

বর্জ্যের শতকরা ওজনের তালিকা (তথ্যসূত্র: আহমেদ এবং রহমান, ২০০০, Water Supply and Sanitation, ITN-Bangladesh)
-----------------------------------------------------------------------------------------
------------------------ বাংলাদেশ ------------- ভারত ---------------- ইউরোপ
------------------------ (ঢাকা, ১৯৯৮) -------- (১৯৯৮)
-----------------------------------------------------------------------------------------
খাবার ও তরকারী ---------------- ৭০ ---------------- ৭৫ ---------------- ৩০
কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী ------- ৪ ---------------- ২ ---------------- ২৭
প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ ------------- ৫ ---------------- ১ ---------------- ৩
পুরনো ছেঁড়া কাপড় -------------- - ---------------- ৩ ---------------- ৩
ধাতব পদার্থ --------------------- ০.১৩ ------------ ০.১ --------------- ৭
কাঁচ ও সিরামিক ---------------- ০.২৫ ------------ ০.২ -------------- ১১
কাঠ -------------------------- ০.১৬ ------------ - ---------------- -
বাগানের ময়লা ----------------- ১১ ---------------- - ---------------- ৪ - ৬
অন্যান্য ------------------------ ৫ --------------- ৭ ---------------- ৩
জলীয় অংশ -------------------- ৬৫ -------------- ২২ – ৩২ --------- ১৫ – ৩৫
--------------------------------------------------------------------------------------------

এই বিশ্লেষণ থেকে লক্ষ্যনীয় যে, বাংলাদেশ বা ভারতের তুলনায় ইউরোপের বর্জ্যে খাবারের আনুপাতিক পরিমান কম। এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপে খাবার-বর্জ্য কম ফেলা হয়, বরং, অন্যান্য বর্জ্য যেমন: কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী, কাঁচ ও সিরামিক, ধাতব পদার্থ – এগুলো এই অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি ফেলা হয় বলে অনুপাতের হিসাবে খাদ্য-জাত পদার্থের পরিমান কমে যায়। বাংলাদেশ বা ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশসমূহে অর্থনৈতীক কারণেই এই জাতীয় পদার্থগুলোর ব্যবহার কম, তাছাড়া বর্জ্য হিসেবে ফেলার বদলে পূণরায় ব্যবহারের জন্য ভাঙ্গারির দোকানে দিয়ে দেয়া হয় বলেও ময়লা হিসেবে এগুলোকে ডাস্টবিনে তেমন দেখা যায় না।
সুতরাং এলাকাভেদে ময়লার আংশিক অনুপাত ভিন্ন হয়, এবং স্বাভাবিকভাবেই এই বৈশিষ্টের কারণে ময়লা ফেলা ও ব্যবস্থাপনার লাগসই প্রযুক্তি/উপায় ভিন্ন হবে।

বর্জ্য-কণার আকার বিশ্লেষণ

যদি আবর্জনা থেকে যান্ত্রিক উপায়ে বা ছাকনির/চালুনির সাহায্যে কিংবা বৈদ্যূতিক চুম্বকের সাহায্যে পূণর্ব্যবহারযোগ্য ময়লা আলাদা করা হয় তাহলে বর্জ্য-কণার আকার সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সাধারণভাবে, প্রতি একক ওজনের ময়লাতে বড় আকারের তুলনায় ছোট আকারের কণার সংখ্যা বেশি থাকে।

বর্জ্যের জলীয় অংশ

জলীয় অংশ বের করার জন্য আংশিক বিশ্লেষণে আলাদা করা আবর্জনার ভাগগুলিকে ওভেনে শুকিয়ে আবার ওজন নেয়া হয়। তারপর, হারানো ওজনকে প্রথমের ওজনের শতকরা অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ

% জলীয় অংশ = ১০০ × (প্রাথমিক ওজন – শুকানোর পরের ওজন)/ প্রাথমিক ওজন

এটা গেল নির্দিষ্ট অংশের/উপাদানের জলীয় অংশ নির্ণয়ের কৌশল। ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ময়লার উপাদানগুলোর অনুপাত ভিন্ন হলেও আগের হিসাব করা প্রতি ধরণের/উপাদানের উপাত্ত থেকে পরীক্ষা ছাড়াই সামগ্রীক জলীয় অংশ বের করার যায়। এজন্য প্রতিটি উপাদানের জলীয় অংশ থেকে সেটা শুকালে কত ওজন হবে সেটা বের করা হয়। তারপর সম্পুর্ন ময়লার শুকানো-ওজনকে মোট ওজন দিয়ে ভাগ করা হয়। একটা উদাহরণ দেখুন -

১০০০ কেজি আবর্জনা কে আংশিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

আবর্জনার উপাদান --- আংশিক বিশ্লেষণে প্রাপ্ত ওজন --- জলীয় অংশ --- হিসাব করা শুকনা-ওজন
খাবার বর্জ্য ---------- ১৫০ কেজি ------------------ ৭০% -------- ৪৫ কেজি
কাগজ -------------- ৪৫০ কেজি ------------------ ৬% --------৪২৩ কেজি
কার্ডবোর্ড ----------- ১০০ কেজি ------------------ ৫% -------- ৯৫ কেজি
প্লাস্টিক -------------- ১০০ কেজি ------------------ ২% -------- ৯৮ কেজি
বাগানের ময়লা ------ ১০০ কেজি ------------------- ৬০% -------- ৪০ কেজি
কাঠ ---------------- ৫০ কেজি ------------------- ২০% -------- ৪০ কেজি
টিনের ক্যান --------- ৫০ কেজি ------------------- ২% -------- ৪৯ কেজি

তাহলে সামগ্রিক আবর্জনার শুকনা-ওজন = ৭৯০কেজি।
সুতরাং, সামগ্রিক আবর্জনার % জলীয় অংশ = ১০০ × (১০০০ – ৭৯০)/১০০০ = ২১%


আবর্জনা নিষ্কাশনের কার্যদক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য জলীয় অংশের হিসাব থাকাটা জরুরী। যদি ময়লা পুড়ানো হয়, তাহলে সেই ময়লাতে আগুন ধরানোর আগে শুকাতে কতটুকু সময় লাগবে সেটা হিসাব করা যায় এবং সেই হিসেবে চুল্লীতে ময়লা দেয়ার সর্বোৎকৃষ্ট হার বের করা যায়। এছাড়া ঐ ময়লার তাপ-মূল্য কত সেটাও আনুমানিক হিসাব করা যায়। ময়লার কিছু অংশ দিয়ে যদি কম্পোস্ট-সার বানানো হয় তাহলেও কম্পোস্ট তৈরীর জন্য সর্বোৎকৃষ্ট জলীয় অনুপাত রক্ষার জন্য কতটুকু শুকনা বস্তু মিশাতে হবে কিংবা কতটুকু পানি মিশাতে হবে তা হিসেব করে বের করা যায়। এছাড়াও বর্জ্যভূমিতে ময়লা ফেলা হলে সেখান থেকে কতটুকু নির্যাস বের হবে সেটাও অনুমান করা সহজ হয় এবং সেই অনুপাতে বর্জভূমির নিচ থেকে নির্যাস বের করার জন্য পাম্প চালানোর হার নির্ণয় করা যায়।

বর্জ্যের ঘনত্ব

বর্জ্যের ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য আংশিক বিশ্লেষণ করা উপাদানগুলোর ওজন নেয়ার পাশাপাশি এগুলোর আয়তনও মাপা হয়। তারপর ওজনকে আয়তন দিয়ে ভাগ করলেই ঘনত্ব পাওয়া যায়। প্রতিটি উপাদানের ঘনত্ব থেকে পূর্বের উদাহরণের মত করেই যে কোন অনুপাতে মিশানো ময়লার ঘনত্ব বের করা সম্ভব।

মূলত বর্জ্য পরিবহন এবং নিষ্কাশনের জন্য ময়লার ঘনত্ব জানা খুব দরকার। ময়লা নেয়ার প্রতিটি গাড়ীর নির্দিষ্ট ভারবহন ক্ষমতা থাকে। এছাড়া গাড়ীগুলোর আকারের সীমাবদ্ধতাও থাকে। কোন এলাকায় প্রতিদিন কী পরিমান (ওজন হিসেবে) ময়লা উৎপন্ন হয় সেটা জানা থাকলে এবং ময়লার আংশিক বিশ্লেষণ থেকে এর ঘনত্ব জানা থাকলে ঐ ময়লা সংগ্রহ করতে নির্দিষ্ট আকারের ও ক্ষমতার কতগুলো ট্রাক লাগবে সেটা ময়লা ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা নির্ধারণ করতে পারে।

কোন কোন জায়গায় ময়লা সংগ্রাহক গাড়ীর মধ্যে ময়লাকে চেপে আয়তন কমিয়ে ফেলার যন্ত্র থাকে। সেসকল ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আকারের প্রতিটি গাড়ীতে কতটুকু ময়লা আনা হচ্ছে সেটা ঘনত্বের উপাত্ত থেকেই হিসাব করা হয়। কত টন ময়লা আনা বা নিষ্কাশিত হল সেই অনুযায়ী ময়লা ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থাকে মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকে। এছাড়া ঐ ময়লা ফেলতে বর্জ্যভূমির আয়তন কত বড় হওয়া উচিৎ বা নির্দিষ্ট আকারের বর্জভূমিতে কতদিন যাবৎ ময়লা ফেলা যাবে সেটা নির্ধারণ করতেও ঘনত্বের উপাত্ত থাকা খুব জরুরী।

রাসায়নিক বৈশিষ্ট

আবর্জনা থেকে বিকল্প উপায়ে শক্তি আহরণ করতে হলে এটার রাসায়নিক বৈশিষ্ট খুব ভালভাবে জেনে রাখা জরুরী। এই উদ্দেশ্যে যেই রাসায়নিক বিশ্লেষণগুলো করা হয় তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ:

১. প্রক্সিমিটি (বাঞ্ছনীয়তা) বিশ্লেষণ
    ক) জলীয় অংশ – ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ঘন্টা রাখলে কতটুকু জলীয় অংশ হারায় সেটা।
    খ) উদ্বায়ী পদার্থ - ৯০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জ্বালালে অতিরিক্ত যে অংশটুকু হারায় সেটা।
    গ) ছাই – পুড়ানোর পর অবশিষ্ট অংশের পরিমান।
    ঘ) আটকে থাকা কার্বন – বাকী অংশ।

২. আল্টিমেট (সর্বশেষ) বিশ্লেষণ
    ক) কার্বনের শতকরা পরিমাণ
    খ) হাইড্রোজেনের শতকরা পরিমাণ
    গ) অক্সিজেনের শতকরা পরিমাণ
    ঘ) নাইট্রোজনের শতকরা পরিমাণ
    ঙ) সালফারের শতকরা পরিমাণ
    চ) ছাইয়ের পরিমাণ

৩. ছাই বিশ্লেষণ - ছাইয়ের গলণ তাপমাত্রা নির্ধারণ

৪. তাপশক্তির পরিমাণ নির্ধারণ
    নির্দিষ্ট ওজনের প্রতিটি উপাদান পুড়ালে উৎপন্ন শক্তির পরিমান মাপা/নির্ধারণ করা হয়।
    ৩টি অবস্থায় শক্তি মাপা হয়: সেগুলো হল
    • যেভাবে ময়লা ফেলা হয় সেভাবে নিয়ে পুড়ালে কী হবে
    • শুকনা অবস্থায় পুড়ালে কী হবে
    • শুকনা অবস্থায় ছাই বাদ দিয়ে পুড়ালে কী হবে।

আবর্জনার গাঠনিক / রাসায়নিক বৈশিষ্ট পরিবর্তনের কারণ

বিভিন্ন কারণে সময়ের সাথে সাথে কোন এলাকা থেকে উৎপন্ন ময়লার বৈশিষ্ট পরিবর্তন হতে পারে। পরিবর্তনের কারণগুলোকে সংক্ষেপে নিম্নলিখিত ভাবে লেখা যায়:
  • প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে - যেমন: খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি পরিবর্তন হলে কিংবা মোড়ক তৈরীর প্রক্রিয়া/উপাদান বদল হলে।
  • বিশ্বের অর্থনৈতীক পরিবর্তনের ফলে - তেলের দাম খুব বেড়ে গেল এর বদলে হয়ত কয়লা ব্যবহৃত হবে, তখন ময়লাতে কয়লার ছাইয়ের পরিমান বেড়ে যাবে। একইভাবে অর্থনৈতীক কারণে বিকল্প পদার্থ ব্যবহার ময়লার গড়নকে প্রভাবিত করবে।
  • ময়লা ব্যবস্থাপনায় পুণরায় ব্যবহার করা বা রিসাইকেল করার নিয়ম/সুবিধা শুরু হলে।
  • নতুন আইন প্রয়োগের ফলে।
  • ঋতূভেদে ময়লার ধরণ আলাদা হবে।
  • এলাকার মানুষের আচরণগত/স্বভাবগত বৈশিষ্ট পরিবর্তন হলে। (প্রশিক্ষণ/সচেতনতা/শিক্ষার কারণে)
  • এছাড়া, ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভৌগলিক পার্থক্যের কারণেও ময়লার গড়ন আলাদা হয়।

0 টি মন্তব্য: