===================
ভূমিকা:
বহুদিন যাবৎ-ই ঘটছে, আজ (৩০-এপ্রিল-২০০৮) প্রথম আলোর খবরে দেখলাম, দূষণে বুড়িগঙ্গার পানির অবস্থা খুবই খারাপ। দেখে শুনে খারাপ লাগে বৈকি। এই পানি শুদ্ধ না হলে একে তো সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার বন্ধ করে দিতে হবে (ঢাকার ১৫% পানি সরবরাহ করে এটি), তাছাড়া বিভিন্ন জটিল পীড়ায় ভুগে নদীর আশেপাশের লোকজনের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে, যার একটা খারাপ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
এ থেকে পরিত্রানের উপায় কী? সমস্ত বাজার ও কলকারখানা, যেগুলো থেকে নদীর পানি দূষণ হচ্ছে সেগুলোকে এই মূহুর্তে বন্ধ করাটা একটা অবাস্তব চিন্তা। ম্যাজিকের মত বর্জ্য শোধনাগারও বানিয়ে ফেলতে পারবেনা কেউ। তাই, আমাদের পরিস্থিতির সাথে মানানসই কোন সমাধান খুঁজতে হবে -- সেটা হয়তো পৃথিবীর অন্য কোথাও না ও দেখা যেতে পারে।
একজন পরিবেশ প্রকৌশলী হিসেবে সমস্যা সমাধানকল্পে মাথায় কিছু চিন্তা ঘুরঘুর করছে। সেগুলো একটু ঝেড়েই ফেলি। বলা যায় না. ... এখন হয়ত এটাকে মাথা খারাপের সার্টিফিকেট পাওয়ার সার্থকতা বলবে, কিন্তু অদুর ভবিষ্যতে হয়তো এটাকেই পৃথিবীতে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান মনে হবে।
দূষণ-পরিশোধনের সাধারণ জ্ঞান:
যে সকল এলাকায় দূষণ হচ্ছে, সেখানকার পানির মাছ ও অন্যান্য প্রাণীও মারা যায়। পানি যে দূষিত হচ্ছে সেটার একটা সহজ প্রমাণ হল গন্ধ। এই গন্ধের কারণ হল মৃতদেহগুলোর পচন প্রক্রিয়া। আরেকটু বিস্তারিত উপাত্ত সংগ্রহ করলে দেখা যাবে যে, ঐ সকল এলাকায় মাছ মারা যাওয়ার আসল কারণ হল পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের অভাব। এটাকে DO বা ডিজলভ্ড অক্সিজেন বলে। এই অভাবের কারণ বায়োকেমিকেল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) দিয়ে মাপা হয়।
পানিতে পচনযোগ্য ময়লা পড়লেই সেটাকে পঁচাতে গিয়ে ঐ ময়লা পানির BOD বেড়ে যায়। কারণ, ব্যাকটেরিয়াগুলো ঐ পচনশীল বস্তুগুলোকে সরল অনুতে ভেঙ্গে ফেলে সেখান থেকে নিজেদের শ্বসন ও বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করে। যত বেশি ময়লা থাকবে পানিতে, ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি হবে তত বেশি। কারণ এ যেন, ব্যাকটেরিয়ার লঙ্গরখানা। ব্যাকটেরিয়ার এই বিরাট খানাপিনা কার্যক্রমের কারণেই ময়লাগুলো দ্রুত পরিশোধিত হয়ে যায়। এটা তাই একটা ভাল প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা করে অক্সিজেনের অভাব।
ব্যাপারটাকে সহজে এভাবে বলা যায় - ব্যাকটেরিয়া যে খানাপিনা করে, সেটা আবার তারা রান্না করে খায়। এই রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনকে। তাই পানিতে ময়লা বেশি পড়লেই রান্নার ধুম পড়ে যায় আর দ্রবীভূত সমস্ত অক্সিজেন খরচ হয়ে যায় ... ... ফলে বাটে পড়ে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী। কারণ মাছ ফুলকার সাহায্যে পানির অক্সিজেন গ্রহণ করে। সেই অক্সিজেনই যদি না থেকে তবে মাছ মারা যাবে সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার হয় না।
এখন এ ধরণের পরিস্থিতি ঠেকাতে হলে কী করণীয়? সকলেই যেটা করে সেটা হল ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে ওদের আর খাদ্য রান্না করার কোন দরকার পড়ে না ... অক্সিজেনও নিঃশেষিত হয় না।
প্রস্তাবনা:
বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু (ব্যাকটেরিয়ার) খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব নয় তাই ওদেরকে জ্বালানী সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। In fact, বর্জ্য পানি শোধনাগারে এই প্রক্রিয়াটাই প্রধাণতঃ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ স্বাভাবিক উপায়ে পানির উপরিতল বা সারফেস থেকে যেহেতু যথেষ্ট জ্বালানী (অক্সিজেন) যোগান দেয়া যাচ্ছে না, তাই কৃত্রিম উপায়ে সেই জ্বালানী (অক্সিজেন) যোগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নদীতে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর পানিকে ওলটপালট করার জন্য ঘূর্ণয়মান পাখা বা খাঁজকাটা ড্রাম ভাসিয়ে রাখতে হবে। এগুলোকে সারফেস এয়ারেটর (surface aerator) বলে। ড্রামগুলো ঘোরানোর জন্য অবশ্য বৈদ্যূতিক শক্তি লাগবে। এই শক্তি সরবরাহের জন্যও কিছু উন্মাদীয় পরিকল্পনা আছে
- সেই শক্তি সৌরশক্তিসংগ্রাহক থেকে সরবরাহ করা যেতে পারে। প্রতিটি ড্রামের কিছু উপরে একটা করে সোলার প্যানেল থাকবে। এতে রাত্রে না হলেও দিনে- ওগুলো ঘুরবে।
- মানুষের শক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ আমার মত - মেদ ভুড়ি কী করি - গোষ্ঠীর লোকজন চর্বি গলানোর জন্য বিদ্যূৎ উৎপন্ন করে এমন সাইক্লিং যন্ত্র ঘুরায় চর্বি গলাতে পারে। নদীর পাড়ে এমন যন্ত্রগুলো সুন্দর পার্কের মধ্যে থাকবে। এটা ঘুরালে যে বিদ্যূত উৎপন্ন হবে সেগুলো দিয়ে মটর ঘুরানো যাবে।
- অথবা সাইক্লিং প্যাডেল যুক্ত যন্ত্রগুলো সরাসরি গিয়ার চাকার সাহায্যে এয়ারেটরের সাথে যুক্ত থাকবে। যারা ঘুরাবে তাঁদের ব্যায়ামও হবে, পরিবেশের উন্নয়নের জন্য কাজও হবে।
- আপাতত দূষণকারী কারখানা, বাজার, জলযান ইত্যাদি উৎস থেকে এগুলো চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ চাঁদা/জরিমানা হিসেবে তোলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে স্পন্সর করতে পারে। ড্রাম এয়ারেটরগুলোর উপরে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থাকবে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর এনভায়রনমেন্টাল কম্প্লায়েন্সের জন্য সার্টিফিকেট পেতে সুবিধা হবে। বিশেষত ISO 14000 সিরিজের সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরণের খরচ সহায়তা করবে।
মোদ্দা কথা হল, পুরা নদীটাকেই একটা শোধনাগার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
============
সচলায়তনে মন্তব্য থেকে আরো কয়েকটা সুন্দর ধারণা বের হয়ে এসেছে।
- এয়ারেশনের জন্য বুদবুদ তৈরী করে এমন পাম্প ব্যবহার করা যেতে পারে।
- বিদ্যূৎ উৎপাদনের জন্য সোলার সেলের বদলে উইন্ডমিল ব্যবহার করা যেতে পারে।
- Littering বা অবৈধ ময়লা ফেলার শাস্তি স্বরূপ বুড়িগঙ্গায় প্যাডেল বোট দিয়ে দুইবার এপার-ওপার করতে হবে।
- এই কাজে কিছু গরীব লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।
- প্রাথমিক ভাবে ছোট স্কেলে ল্যাবরেটরী এবং গুলশানের লেকে পরীক্ষা করে তারপর প্রস্তাব আকারে বুড়িগঙ্গায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।
- সিঙ্গাপুরের মত, স্কুলের পরিবেশ বিজ্ঞান প্রজেক্ট হিসেবে নদীর ময়লা পরিষ্কারের ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। এতে নির্দিষ্ট সময়ে নদী থেকে ভাসমান বোতল, প্লাস্টিক ইত্যাদি ময়লা ছাকনী দিয়ে তুলবে ছাত্ররা। ফলে
- নদীর কিছু উপকার হবে;
- খেলাচ্ছলে ছাত্রদের সচেতনতা বাড়বে;
- ভবিষ্যতের সচেতন নাগরিকের বীজ রোপিত হবে;
- ছাত্রদের মাধ্যমে ঐ পরিবারে সচেতনতা ...
- এবং সেখান থেকে দূষণকারীদের বিরূদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে উঠবে।
- বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (BAPA)-এ ইতিমধ্যে মেইল করা হয়েছে।

0 টি মন্তব্য:
Post a Comment