পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের উপরে বিদ্যূৎ উৎপাদনের প্রভাব

(লেখাটি প্রযুক্তি কথন-২ এ প্রকাশিত হয়েছিলো)

ভূমিকা

বিদ্যূতের সহজপ্রাপ্যতা বর্তমান সভ্যতার অন্যতম প্রাণসঞ্চারক। মানব সভ্যতার প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই বিদ্যূৎ ছাড়া অচল। সভ্যতার প্রয়োজনে তাই বিদ্যূৎ উৎপাদন অপরিহার্য। কিন্তু এই বিদ্যূৎ উৎপাদন করতে গিয়ে সেটা পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হলে সেটা দীর্ঘমেয়াদে সভ্যতার জন্য উপকারী ভূমিকা রাখতে পারবে না। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সুবিধার্থে পরিবেশের উপরে বিদ্যূৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রভাবের খুটিনাটি জেনে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই প্রবন্ধে পরিবেশের উপরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতির প্রভাবগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে পরিবেশ বলতে মূলত বাস্তুতন্ত্রকে (Ecology) বুঝানো হয়েছে। পরিবেশের অন্যান্য অংশসমূহ, যথা:সামাজিক, রাজনৈতীক, অর্থনৈতীক, নান্দনিকতা ইত্যাদিকে এই বিশ্লেষণ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই বিশ্লেষণে বাসগৃহে/কারখানায় ব্যবহৃত খুব ছোট ছোট বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে বিবেচনায় আনা হয়নি। বিদ্যূৎ উৎপাদন সংক্রান্ত যে বিষয়গুলি/পদ্ধতিগুলো আলোচনায় স্থান পেয়েছে তা হল:

১. জীবাশ্ম জ্বালানী দহন করে বিদ্যূৎ উৎপাদন
২. জলবিদ্যূৎ
৩. বায়ুশক্তির সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন
৪. জোয়ার-ভাটার শক্তির সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন
৫. সৌরবিদ্যূৎ
৬. আনবিক চূল্লীর দ্বারা বিদ্যূৎ উৎপাদন
৭. ভূ-গর্ভস্থ তাপের সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন
৮. নেগাওয়াট পদ্ধতি (বিদ্যূৎ সাশ্রয়)

১. জীবাশ্ম জ্বালানী দহনের ফলে বায়ু দূষণ

অধুনা বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানী পুড়িয়ে বেশিরভাগ বিদ্যূৎ উৎপাদন করা হয়। এই কাজে জ্বালানী পুড়িয়ে পানি থেকে বাষ্প উৎপন্ন করা হয় এবং সেই বাষ্প দিয়ে স্টীম টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যূৎ উৎপাদনের জেনারেটর চালানো হয়।

পরিবেশের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট

  • সহজলভ্য: জীবাশ্ম জ্বালানী গুলো সহজেই পরিবহন করা সম্ভব বলে এই পদ্ধতিতে যেখানে দরকার সেখানে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা যায়। এছাড়া যানবাহনের জন্য জ্বালানী পরিবহন ও সংগ্রহের অবকাঠামোগুলোও এটার প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
  • মজুদের সীমাবদ্ধতা: পৃথিবীতে এই জীবাশ্ম জ্বালানীর বিশাল সরবরাহ বিদ্যমান, যদিও এগুলো অসীম নয় বরং নির্দিষ্ট সময় পরে এগুলো শেষ হয়ে যাবে। এটাকে টেকসই করার জন্য প্রতিনিয়তই নতুন নতুন তেলের মজুদ খুঁজে বের করতে হবে যা এককথায় অসম্ভব। কাজেই নিঃশেষ হয়ে যাবে এমন একটা জ্বালানীর উপরে নির্ভর করাটা এই বিদ্যূৎ উৎপাদন পদ্ধতির জন্য একটি বড় হুমকি।
    • ইদানিং অবশ্য জৈব জ্বালানী ব্যবহার করে বিদ্যূৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতিতে জৈব পদার্থকে গাঁজিয়ে সেখান থেকে ইথানল উৎপাদন করা হয় যা জ্বালানী হিসেবে পুড়ানো হয়। এই পদ্ধতিতে মজুদের সীমাবদ্ধতার অসুবিধা অনেকাংশেই দুর হয়।
  • গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া: জ্বালানীর পরিমাণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ছাড়াও এ পদ্ধতিতে সবচেয়ে বড় হুমকি হল জ্বালানী পুড়ানোর ফলে এ থেকে নির্গত গ্যাসের বায়ু দূষণ। জীবাশ্ম জ্বালানীতে প্রচুর পরিমাণে কার্বন রয়েছে যা পুড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় - যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির জন্য দায়ী একটি গ্রীনহাউজ গ্যাস। কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির সাথে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্পর্কের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিকগণ একমত হলেও জীবাশ্ম জ্বালানীর উৎপাদকগণ এটার বিরূদ্ধে প্রচারণাতে এবং এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে খুবই সক্রিয়।
    • জীবাশ্ম জ্বালানীর বদলে জৈব জ্বালানী ব্যবহার করলে গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী গ্যাসের নির্গমন কমে যায়। এছাড়া জৈব পদার্থ উৎপাদনের সময় সেগুলোও নিজেদের শ্বসনের প্রয়োজনে বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে ব্যবহার করে গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
    • এছাড়া জৈব পদার্থগুলো পচনের ফলে প্রকৃতিতে যে মিথেন গ্যাস নির্গত হত সেটা না হয়ে গ্যাসটিকে পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা রোধে এটা ভূমিকা রাখে। উল্লেখ্য যে, মিথেন গ্যাস পুড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় যা মিথেনের তুলনায় ত্রিশ ভাগের একভাগ গ্রীনহাউজ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
  • বায়ুদূষণকারী পদার্থ: জ্বালানী এবং দহন প্রক্রিয়ার প্রকারভেদে এ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও বিভিন্ন রকম দূষণ হতে পারে। মাঝে মাঝে এ থেকে ওজোন, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং অন্য গ্যাস নির্গত হয়, এছাড়া কণাকার/দানাদার পদার্থও উৎপন্ন হয়। সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইডগুলো ধোঁয়াশা (smog) ও অম্লবৃষ্টির (acid rain) জন্য দায়ী। অতীতে এই ধরণের সমস্যাগুলো দূর করার জন্য কারখানার মালিকেরা ধোঁয়া/গ্যাস নির্গমনের জন্য উঁচু উঁচু চিমনী তৈরী করতেন। এতে দূষনকারী পদার্থগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এর ঘনত্ব কমে যেত। এই পদ্ধতিতে স্থানীয় দূষণ কমানো গেলেও সার্বিক ভাবে পৃথিবীর দূষণ বৃদ্ধি পায়।
  • তেজস্ক্রিয়তা: জীবাশ্ম জ্বালানীগুলোর মধ্যে, বিশেষত কয়লার মধ্যে অল্প পরিমানে তেজষ্ক্রিয় পদার্থ আছে। কাজেই প্রচুর পরিমানে এগুলো পুড়ালে এগুলো স্থানীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে তেজষ্ক্রিয় দূষণ ঘটায়। এই দূষণের পরিমাণ সাধারণত নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন বা তেজষ্ক্রিয় বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্রের চেয়ে বেশি হয়, কারণ তেজষ্ক্রিয় কেন্দ্রগুলোতে তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানো রোধে বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে।
  • পারদ দূষণ: এছাড়াও কয়লাতে সামান্য পরিমানে পারদ বা আর্সেনিকের মত বিষাক্ত খনিজ পদার্থ (toxic heavy metal) থাকে। বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্রের বয়লারে পুড়ানো কয়লা থেকে বাষ্পীভূত পারদ বাতাসে ভেসে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষের ক্রিয়াকর্মের কারণে অন্য যে সকল উৎস থেকে পারদ ছড়িয়ে পড়ে সেগুলোতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কারণে দূষণ কম হয় এবং সেই কারণে মোট পারদ দূষণের সিংহভাগ আসে বিদ্যূৎ কেন্দ্রের কয়লা থেকে ছড়ানো পারদ বাষ্প থেকে। এই দূষণ কমানোর জন্য বিদ্যূৎ কেন্দ্রের নকশায় দূষণ প্রতিরোধক ব্যবস্থা সংযোজন করা যায়।
  • খনিজ কয়লা আহরণজনিত ক্ষতি: যুক্তরাষ্ট্রে ওপেন মাইনিং পদ্ধতিতে কয়লা আহরণ করা হয়। এতে পাহাড়ের নিচে থাকা কয়লা আহরণের জন্য এর উপরের অংশ কেটে/বিষ্ফোরকের সাহায্যে সরিয়ে ফেলা হয়। বর্জ্য আকরিকগুলো খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে এবং এ থেকে পানি চুইয়ে উৎপন্ন সালফিউরিক এসিড আশেপাশের জলাশয়ে প্রবাহিত হয় এবং এর ফলে সেখানকার সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণী মৃত্যূবরণ করে।

২. জলবিদ্যূৎ

জলবিদ্যূৎ তৈরীর জন্য সাধারণত পাহাড়ী এলাকায় বাঁধ দিয়ে বিরাট এলাকায় পানি জমানো হয়। পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করে সেই পানির স্থিতিশক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত করে, পানির ধারা দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা হয়।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট

  • জলমগ্নতা: ফলে বিরাট এলাকা ডুবে যায় যেটা পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। ঐ এলাকার স্বাভাবিক জৈববৈচিত্র নষ্ট হয়ে জলাভূমির জীববৈচিত্র সৃষ্টি হয়।
  • জলমগ্নতার জন্য শুধু জীববৈচিত্রই নয়, মানুষের আবাসস্থলও হারাতে হয়। যেটা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের কাপ্তাই জলবিদ্যূৎ প্রকল্প এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
  • ভূ-গর্ভস্থ চাপের সাম্যাবস্থা: বাঁধ দিয়ে আটকানো পানির ওজন ঐ এলাকার মাটিস্তরের উপরে চাপ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঐ এলাকায় ভূগর্ভে চাপের সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়ে পড়ে চ্যূতি বা ফাটলের সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে ঐ এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন: পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয় বলে বাঁধের উজানে জমা পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন গ্যাসের পরিমান কমে যায়। ফলে সেখানকার নতুন সৃষ্ট জলজ জীববৈচিত্রও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
  • উৎপন্ন বিদ্যূতের পরিমানের তুলনায় এর জন্য ক্ষতিগ্রস্থ পরিবেশের পরিমান অনেক বেশি।

৩. বায়ুশক্তির সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন

পৃথিবীর পৃষ্ঠদিয়ে সমভাবে চলমান বায়ুপ্রবাহ থেকে যান্ত্রিক শক্তি আদায় করা যায়। মোটামুটি উচ্চ বায়ুপ্রবাহ আছে এমন জায়গায় বিস্তৃত জায়গা জুড়ে বায়ুচালিত টার্বাইন স্থাপন করে বায়ুবিদ্যূৎকেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়।
  • অতীতের বায়ুবিদ্যূৎ টার্বাইনগুলো অল্প এলাকায় ঘণ করে স্থাপন করা হত; এগুলোআকারে ছোট হত এবং প্রচুর শব্দদূষণ করতো। এই কারণে পুরানা বায়ুবিদ্যূৎ টার্বাইনগুলো স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে তেমন আকর্ষনীয় হয় নাই।
  • এই টার্বাইনগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে প্রায়শঃই এর পাখার আঘাতে পাখির মৃত্যূ ঘটে।
  • প্রবাহের শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের ফলে টার্বাইন এলাকার ভাটিতে অবস্থিত এলাকায় স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ কমে যায়।
  • আধুনিক বৃহদাকার টার্বাইনগুলো উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলো অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে।
  • কিছু কিছু এলাকায় যেখানে যথেষ্ঠ বায়ু প্রবাহ আছে এবং বিদ্যূতের দাম বেশি সেখানে গৃহে ব্যবহার যোগ্য ছোট বায়ুবিদ্যূৎ টার্বাইন স্থাপন করে বিদ্যূৎ ব্যবহারের খরচ কমানো সম্ভব।
  • বায়ুবিদ্যূৎ কেন্দ্র স্থাপনে একটা স্থানের নৈসর্গ নষ্ট হতে পারে। তাই নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে এর নকশা সতর্কতার সাথে করা উচিত।
কৃষিপ্রধান এলাকায় স্থাপিত আধুনিক বায়ুবিদ্যূৎ কেন্দ্র, বিদ্যূৎ উৎপাদনের অন্য পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব। কারণ:
  • পূণর্ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎসগুলোর মধ্যে প্রতি ইউনিট বিদ্যূৎ উৎপাদনে এ পদ্ধতিতে গড়ে কম স্থান ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে এগুলো অবশ্য বাড়ীর ছাদে অবস্থিত সৌরবিদ্যূৎ উৎপাদকের সাথে তুলনীয়, কারণ এই টাওয়ারগুলোর নিচেও ফসল উৎপাদন এবং গবাদিপশুচারণ করা যায়।
  • এধরণের স্থাপনার খরচ কয়েকমাসের উৎপাদিত বিদ্যূতের মূল্যের সমতূল্য।
  • এধরণের স্থাপনা তৈরীর সময় গ্রীনহাউজ গ্যাস উৎপাদন খুবই কম, এবং দিনে দিনে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এর পরিমান আরও কমে যাচ্ছে। তাছাড়া, পরিচলনের সময়ে (বিদ্যূৎ উৎপাদনের সময়) এটা থেকে কোন ক্ষতিকারক গ্যাস উৎপাদিত হয় না।
  • আধুনিক বায়ু টার্বাইনগুলো অনেক ধীরগতিতে ঘোরে (ঘূর্ণন/মিনিট হিসেবে), ফলে এগুলো দিয়ে পাখির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।

৪. জোয়ার-ভাটার শক্তির সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন

যে সকল এলাকায় জোয়ার ভাটার পার্থক্য অনেক বেশি সেসব এলাকায় সমূদ্রের জোয়ার-ভাটার ঢেউয়ের শক্তি ব্যবহারে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এটি একটি পূণর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি এবং যতদিন চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করবে, ততদিন কার্যকর থাকবে। কিন্তু এটাতেও জলবিদ্যূৎ প্রকল্পের মত কিছু অসুবিধা রয়েছে।
  • জোয়ার-ভাটার শক্তির সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন করতে হলে সাধারণত বৃহদাকার বাঁধ দেয়ার দরকার পড়ে। এর ফলে বাঁধের দুই পাশের সামুদ্রিক প্রাণীদের বিচরণ বাধাগ্রস্থ হয়, ফলে সেখানকার জলজ বাস্তুতন্ত্র হুমকীর সম্মুখিন হয়।
  • এই ধরণের বিদ্যূৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে সেই এলাকার আশেপাশে জোয়ার ভাটার ব্যবধান কমে বা বেড়ে যেতে পারে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে পানিতে ডুবে থাকা বা শুকনা থাকার সময়কাল পরিবর্তীত হয় যা ওখানকার বাস্তুতন্ত্রকে পরিবর্তীত করে দিতে পারে।

৫. সৌরবিদ্যূৎ

সূর্যের আলোর সাহায্যে সৌরকোষের মাধ্যমে ডিসি বিদ্যূৎ উৎপাদন করা যায়। এছাড়া, সূর্যের আলোর তাপ ব্যবহার করেও (অনেকগুলো প্রতিফলক আয়না লাগে) সাধারণ উপায়ে স্টীম জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা যায়।
  • সৌরকোষের সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন আপাতদৃষ্টিতে যথেষ্ট নিরাপদ মনে হলেও, এই কোষগুলো তৈরী করতে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো সংগ্রহ করতে জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহার করতে হয়। ফলে সৌরকোষের কারণে ঐ সংক্রান্ত কিছু দূষণ ঘটে।
  • সৌরকৌষ দ্বারা উৎপন্ন বিদ্যূৎ লেড-এসিড ব্যাটারীতে সঞ্চয় করতে হয়। কারণ রাত্রে বিদ্যূৎ উৎপাদন হয় না। এই ব্যাটারীর উপাদানগুলোর কারণেও কিছুটা দূষণ ঘটতে পারে (ব্যাটারি উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং নষ্ট ব্যাটারি ফেলার প্রক্রিয়ায়)।

৬. আনবিক চূল্লীর দ্বারা বিদ্যূৎ উৎপাদন

  • আনবিক চুল্লীগুলো জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহার করেনা বলে এরা সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমণ করে না। একক ওজনের জ্বালানী থেকে আনবিক পদ্ধতিতে অনেক বেশি শক্তি পাওয়া যায় বলে, এর জ্বালানীগুলো আহরণ, সংযোজন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা পরিবহনের সময় যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় জীবাশ্ম জ্বালানীর সাথে তুলনামূলক বিচারে তা খুবই সামান্য।
  • বড় ধরণের আনবিক বিদ্যূৎ কেন্দ্রের উৎপাদকগুলো ঠান্ডা করার কাজে যে পানি ব্যবহার করা হয়, সেই গরম পানিগুলো সাধারণত আশেপাশের জলাশয়ে ফেলা হয়। এর ফলে জলাশয়ের অংশবিশেষে অনাকাঙ্খিত তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঘটে যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রকে নষ্ট করে ফেলে।
  • আনবিক শক্তি কেন্দ্র থেকে তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানো রোধ করার জন্য বিভিন্ন নিয়মনীতি রয়েছে। এগুলো মেনে চললে তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানোর আশংকা থাকে না। তবে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কিছুটা তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
  • এর জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিডয়াম আহরণের সময় খনি এলাকার আশেপাশে পরিবেশ দূষিত হতে পারে। ব্যবহৃত জ্বালানী নিষ্কাশনের নিরাপদ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে; নিরাপদ পদ্ধতি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে এই জ্বালানী মজুদ করে রাখার বিষয়টা গভীর বিবেচনা এবং সমালোচনার মধ্যে আছে।
  • এছাড়া আনবিক শক্তি কেন্দ্রের জন্য ব্যবহারযোগ্য জ্বালানী ঐ কাজে ব্যবহার না করে আনবিক/পারমানবিক অস্ত্র বানানোর জন্য ব্যবহার করার অপচেষ্টা হতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী পারমানবিক অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার পথে হুমকীস্বরূপ।
  • পারমানবিক চূল্লীর কাঠামোটাই (Reactor) তেজষ্ক্রিয় পদার্থে পরিণত হয়। তাই স্বল্পখরচের নিরাপদ নিষ্কাশন ব্যবস্থা উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত এগুলোকে নিরাপদে মজুদ করে রাখতে হবে।

৭. ভূ-গর্ভস্থ তাপের সাহায্যে বিদ্যূৎ উৎপাদন

কিছু কিছু এলাকায় বিশেষত আগ্নেয়গিরির আশেপাশের স্থানে ভূগর্ভস্থ তাপ ব্যবহার করে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা যেতে পারে (Geothermal Power)। ভূপৃষ্ঠের গভীরে যে তাপ আছে তার প্রভাবে পানি থেকে উৎপন্ন গরম বাষ্প ব্যবহার করে টারবাইন জেনারেটর ঘুরিয়ে বিদ্যূৎ উৎপাদন করা হয়।
  • এ ধরণের পদ্ধতিতে কোন জ্বালানী পুড়ানো হয় না, তাই সেই কারণে দূষণ ঘটে না।
  • কিন্তু ভূগর্ভস্থ কূপগুলো থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই বাষ্পের সাথে এমন সব পদার্থ মিশ্রিত থাকে যে বিদ্যূৎ উৎপাদনের পূর্বে সেগুলোকে অবশ্যই বাষ্প থেকে আলাদা করতে হয় এবং পরিবেশ বান্ধব উপায়ে নিষ্কাশিত করতে হয়।
  • এছাড়া এই ধরণের পদ্ধতিতে শীতলীকরণের জন্য ব্যবহৃত পানি জলাশয়ে ফেললে তাপদূষণের কারণে সেখানকার স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

৮. নেগাওয়াট পদ্ধতি (বিদ্যূৎ সাশ্রয়)

এই পদ্ধতিটি আসলে কোনো বিদ্যূৎ উৎপাদন পদ্ধতি নয়, বরং বিদ্যূৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে সাশ্রয়ী ব্যবহারের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর বিকল্প পদ্ধতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা বনাম সরবরাহের সমীকরণে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর পরিবর্তে চাহিদা কমিয়ে সীমিত সরবরাহের মধ্যে আনার চেষ্টা এবং এ সংক্রান্ত কার্যক্রম নেগাওয়াট পদ্ধতির অন্তর্গত। কাজেই বিদ্যূৎ সাশ্রয়ের জন্য বিনিয়োগকে নতুন বিদ্যূৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ এবং পরিবেশের উপর প্রভাবের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।বিদ্যূতের সাশ্রয়ের জন্য বিদ্যূৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রগুলোর ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিবেচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে:
  • শক্তি সাশ্রয়ী বাতি - পরিবেশের উপর এর প্রভাব সামান্য।
  • ভবনসমূহের তাপ ও বায়ু নিরোধী ব্যবস্থা উন্নয়নকরণ – পরিবেশের উপর এটির প্রভাবও সামান্য।
  • পুরাতন যন্ত্রপাতি এবং কারখানাকে প্রতিস্থাপন করা - পরিবেশের উপর এর খারাপ প্রভাব সামান্য, বরং নতুন উন্নত যন্ত্রপাতি থেকে কম দূষণ হওয়ার ফলে সেটা পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাবে।
  • বিদ্যূৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চাহিদার চাপ (Peak demand) কমানোর জন্য বা সেটাকে অন্য সময়ে সরিয়ে দেয়ার জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে:
    • সঞ্চয়ী হিটার – পুরাতন ব্যবস্থাগুলোতে অ্যাসবেস্টস ব্যবহৃত হত। নতুন ব্যবস্থায় তা না থাকায় পরিবেশের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব নাই।
    • এছাড়া চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোন এলাকায় বিদ্যূৎ সরবরাহ বাড়িয়ে বা কমিয়ে নির্দিষ্ট প্রকার গ্রাহকের চাহিদা নিয়ন্ত্রন করা যায় – এতে পরিবেশের উপর সামান্য প্রভাব পড়বে।
    • শীতাতপ নিয়ন্ত্রনের জন্য আগের রাত্রে বরফ বানিয়ে তাপনিরোধী উপায়ে রক্ষা করে সেটা পরদিন ব্যবহার করা যায় – এতেও পরিবেশের উপর সামান্য প্রভাব পড়বে।
    • রাতে যখন বিদ্যূতের চাহিদা কম থাকবে তখন জলবিদ্যূৎ প্রকল্পে উৎপন্ন অতিরিক্ত বিদ্যূৎ খরচ করে নিচ থেকে কিছু পানি উপরের জলাধারে তুলে রাখা যেতে পারে। এতে পরিবেশের উপর যথেষ্ট প্রভাব পড়বে।
    • অন্যান্য শক্তি সাশ্রয় ও ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি - পরিবেশের উপর বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলে।
    • এখানে উল্লেখ্য যে, উচ্চ চাহিদার সময় পরিবর্তন করাতে মোট বিদ্যূৎ চাহিদা কমবে না। তবে এর ফলে উচ্চ চাহিদার চাপের সময় সেটা মেটাতে অতিরিক্ত বিদ্যূৎ কেন্দ্র বানানোর খরচ বাঁচিয়ে দেবে।

উপসংহার

বিদ্যূৎ উৎপাদনে আপাতদৃষ্টিতে যতটুকুই খরচ মনে হউক না কেন এর ফলে সামগ্রীক ভাবে পরিবেশের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেগুলোর ক্ষতির পরিমান অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বেশি হয়। কিছু কিছু ক্ষতি আছে যা অপরিবর্তনীয়। তাই সভ্যতার জন্য অপরিহার্য বিদ্যূৎ উৎপাদনের সময় তুলনামূলক বিচারে কম ক্ষতিকারক (সরাসরি খরচ এবং পরিবেশের মূল্য) প্রভাব সম্পন্ন বিষয়টা বেছে নেয়া জরুরী। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে দূরবর্তী স্থানে উৎপাদিত বিদ্যূৎ আমদানী করার সময় পরিবেশের উপর বিদ্যূৎ পরিবহন তার/টাওয়ারগুলোর বিদ্যূৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্রের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টাও বিবেচনায় আনতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেহেতু ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয় তাই যতদুর সম্ভব এর অপচয় এবং অদক্ষ ব্যবহার কমিয়ে ফেলাটাই সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা বলে মনে হয়। পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবগুলো কাটিয়ে উঠতে পরিবেশ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড / প্রকল্পের কথাও বিবেচনা করা উচিত।

তথ্যসূত্রসমূহ:

0 টি মন্তব্য: