পানিবাহী সেতু

ধরুন আপনার দোতলা বাসাটির অবস্থান টলটলে বিশুদ্ধ পানি বিশিষ্ট একটা নদীর ধারে। তবে সেই নদী ধরে ২০০ ফুট উজানে গেলেই প্রায় ৩০ ফুট উঁচু জলপ্রপাতে পৌঁছে যাবেন, যেখান থেকে পানি পড়ে এই নদী তৈরী হয়েছে। এখন বাসায় যদি আপনার পানি সরবরাহের দরকার হয় তবে কোত্থেকে পানি নেবেন?

নদী থেকে নিতে গেলে পানি তোলার পাম্প লাগবে, এটা চালাতে এবং রক্ষণাবেক্ষন করতে যথেষ্ট খরচ হবে। কাজেই সমাধান হবে যদি জলপ্রপাতের উপর থেকে একটা কৃত্রিম নালা লাগিয়ে বাসার ছাদের ট্যাংকে সরাসরি পানি আনার ব্যবস্থা করা। সেই নালা বানাতে একবার খরচ হবে, কিন্তু পাম্প কিনতে হবে না। আর মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচও পাম্পের চেয়ে অনেক কম হবে।

এই বুদ্ধিটিই অনেক আগে থেকে পৃথিবীতে প্রচলিত। প্রাচীন রোমে শহরে পানি আনার জন্য সরাসরি পাহাড়ের উপরের ঝরনা থেকে উঁচু নালা তৈরী করে আনা হয়েছিলো যার নিদর্শন এখনও বিদ্যমান। পানি = অ্যাকোয়া আর নালা = ডাক্ট (duct) থেকে এর নাম হয়েছিলো অ্যাকোয়াডাক্ট।

ছবি দেখুন: (ক্লিক করলে বড় হবে)
চিত্র: প্রাচীন ফ্রান্সের অ্যাকোয়াডাক্ট (খ্রীষ্টপূর্ব ১৯ সালে তৈরী)


চিত্র: অ্যাকোয়াডাক্টের মূলনীতি


এই ছবিটা ভারতের:


এটাও ভারতীয়:


কৃষিকাজের জন্য পানি সরবরাহের খালগুলোও এমন জমি থেকে উঁচুতে থাকতে হয়। কখনও কখনও এই খালগুলো এর জন্য পানি অপসারণ খালের উপর দিয়ে এভাবে যেতে পারে। রোমের অ্যাকোয়াডাক্টগুলোও সেচের পানি আনতো।


চিত্র: চীনে সেচের পানিবাহী সেতু; পাশে পুরানোটির বদলে নতুন একটা তৈরী হচ্ছে।

তবে যে জন্য এই পোস্ট করলাম সেটা আরও মজার। জার্মানীতে ২০০৩ সালে একটা বিরাট পানির সেতু তৈরী হয়। যুগ যুগ ধরে জার্মানীর নদী ও খালের সুবিস্তৃত নেটওয়র্ক সেদেশের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই পানিপথের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল বার্লিনের ৭৫মাইল পশ্চিমে ম্যাগডেবার্গে (Magdeburg), যেখানে মিটল্যান্ড (Mittelland) এবং এলব-হ্যাভেল (Elbe-Havel) খালদ্বয় এলব নদীতে মিশেছিলো। ২০০৩ সালের আগ পর্যন্ত এটা ছিল একটা গ্যাঞ্জামের জায়গা। পূর্ব-পশ্চিমে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে এখানে ৭.৫ মাইল ঘুরে যেতে হত এবং তিনটা লক অতিক্রম করতে হত। এতে নৌচলাচলে বিঘ্ন ঘটত, বিশেষত যখন শুষ্কমৌসুমে এলব নদীতে পানি কমে যেত তখন। এই নতুন পানি-সেতু সেই সমস্যার সমাধান করেছে এবং বার্লিন থেকে উত্তরে হামবুর্গ সমূদ্র বন্দরে এবং পশ্চিমে উলফ্সবার্গ, হ্যানোভার এবং রুহর শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত সারাবছর নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করবে। এটা খালের মতই ১০৫ ফুট চওড়া ও ১৪ ফুট গভীরতা বিশিষ্ট, ফলে ৩৬০ফুট পর্যন্ত লম্বা কার্গো জাহাজ বা ৬১০ফুট পর্যন্ত লম্বা বার্জ-ট্রেন চলতে পারবে।
(লক হল উচু পানিস্তর থেকে নিচু পানি স্তরে যাওয়ার জন্য একটা পদ্ধতি - পানামা খালের লক বেশ বিখ্যাত, কারণ খালের পানি সমুদ্রের পানির লেভেল থেকে অনেক উঁচুতে। এই লক হল একটা হাউজ যেটা উঁচু ও নিচু পানির তল বিশিষ্ট জায়গার মধ্যে থাকে। দুই দিকেই এর দুটা প্রবেশদ্বার থাকে। নিচু থেকে উঁচুতে যেতে নিচু পানির দিকের দরজা খুলে জাহাজ এতে প্রবেশ করে। তারপর এই দরজা বন্ধ করে উঁচু পানি থেকে পাইপ দিয়ে এখানে পানি ভরতে দেয়া হয়, ফলে আস্তে আস্তে জাহাজটি ভেসে উঁচু পানির সমান স্তরে চলে আসে। এখন উঁচু পানির দিকের দরজা খুলে জাহাজ বের হয়ে যায়। আবার উঁচু পানি থেকে কোনো জাহাজ এখানে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে এবং পাইপ দিয়ে নিচু পানিতে আস্তে আস্তে পানি বের হয়ে যেতে দেয়, ফলে জাহাজের নিচে থাকা পানি কমতে কমতে নিচু পানির সমান হয়। তখন ঐদিকের দরজা খুলে জাহাজ বের হয়ে যায়।)

ছবি জার্মানির পানিবাহী সেতু!
চিত্র: নদীর উপরে খাল, সেটা দিয়ে আবার জাহাজ চলছে (জার্মানি)


চিত্র: স্যাটেলাইটের ছবিতে জার্মানির পানির সেতু




চিত্র: চলছে মালবাহি জাহাজ

তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া - অ্যাকোয়াডাক্ট
উইকিপিডিয়া - নৌচলাচল উপযোগী অ্যাকোয়াডাক্ট
উইকিপিডিয়া - লক
সূত্র: http://www.profsurv.com/
এবং ছবিগুলোতে ক্লিক করলে মূল সূত্রে যাওয়া যাবে।

0 টি মন্তব্য: