পায়ের তলায় বিপদ

আমার দাদাবাড়ির উঠানে একটা ইন্দিরা বা কূঁয়া ছিল। সেই ইন্দিরার বাঁধানো পাড়ে পা পিছলে আছাড় খাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। শীতের সকালে কূঁয়ার পানি থাকতো কুসুম গরম। এদিকে কেচ্ছা কাহিনী শুনতাম যে রাজার বাড়ির কূঁয়ার ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ থাকতো, যা দিয়ে নদীপথে নৌকায় করে পলায়ন করা যেত আক্রমনের শিকার হলে শেষ উপায় হিসেবে। আমাদের দেশে নাকি মাটির নিচে পানির অভাব নাই, পানির উপর দেশ ভাসতেছে। হাকলবেরি ফিনের গল্পেও আমাজান নদীতে ভাসমান দ্বীপের কথা পড়েছিলাম। দুইয়ে দুইয়ে চাইর মিলাতে সময় লাগে নাই ... ... নির্ঘাৎ আমাদের কূঁয়ার পানিও নদীর সাথে সংযুক্ত, নাইলে এ্যাত পানি আসে কোত্থেকে।

ভাবতাম, বাবারে কী ভয়ের ব্যাপার। মাটির তলায় অমন পানি ছল ছল করলে তো বিপদ। হঠাৎ যদি কোন গর্ত দিয়ে পড়ে যাই তাইলে নদীতে লাশ ভেসে উঠা ছাড়া গতি নাই, কারণ সাঁতার তো পারি না। কাউকে জিজ্ঞেসও করতে সাহস পেতাম না। আবার এই নিয়ে কাউকে ভয় পেতেও দেখতাম না - তাজ্জব ব্যাপার। অনেক দিন লেগেছিলো ঐ ভয় কাটতে। পানির তলে মাটির কণার ফাঁকে থাকা ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যাপার স্যাপার বুঝেছিলাম অনেক বড় হয়ে - আর মনে মনে নিজের বোকামির কথা মনে করে হেসেছিলাম, আজও হাসি।

কিন্তু সেই হাসিও ইদানিং নিজের কাছেই একটু বোকা বোকা লাগছে। কারণ ল্যান্ড সাবসিডেন্স এবং সিঙ্কহোল নামক দুটি বিষয় যা আগে জানা ছিল না।

আমাদের রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখা যায় হঠাৎ করে এক জায়গায় দেবে গেছে। তারপর ওখানে বিরাট গর্ত, সহৃদয় কেউ হয়তো একটা গাছের ডাল পুতে দিয়ে চলাচলকারীদেরকে সতর্ক করেছে। রাস্তার নিচের বালুর স্তর আন্ডারগ্রাউন্ড সুয়ারেজ লাইনের কোন একটা ফাটল দিয়ে ধুয়ে চলে গেলে এমন ফাঁকা জায়গা তৈরী হয় রাস্তার নিচে। রাস্তার নিচে তেমন গভীর বালুর স্তর দেয়া হয় না বলে গর্ত সেরকম বড় হয়না হয়তো। কিন্তু পৃথিবীর সব জায়গায় এমন সহজ হয় না .... আস্ত গাড়ি গিলে ফেলার মত গর্তও হতে পারে এভাবে। আর এমন বড় গর্ত হলে আশেপাশের বাসাবাড়ির ভিতও নাড়িয়ে দিতে পারে। নেট থেকে পাওয়া কয়েকটা ছবি দেখুন।



একই রকম ব্যাপার ঘটতে পারে অন্য জায়গাতেও। মাটির তলে প্রায় সবখানেই পানি আছে, কিংবা অন্তত বৃষ্টির সময়ে পানি যায়, কাজেই নিচের মাটি বা অন্য খনিজ পদার্থ গলে গিয়ে ফাঁকা স্থান তৈরী হতে পারে যে কোনখানেই। স্বাভাবিক উপায়ে এমন না ঘটলেও সুয়ারেজ লাইন থাকলে (এবং তাতে ফুটা থাকলে) গলে যাওয়া পদার্থ সহজেই নিষ্ক্রান্ত হতে পারে।

চায়নাতে কারবারটা দেখেন। একটুর জন্য বেঁচে গেছে এই বাড়িটা। রাতের আঁধারে কয়েকটা ফলগাছসহ হুড়মুড় করে ফুস -
আরেকটু হলেই পুরা তলিয়ে যাইতো এই বাড়িটা:
এই বাড়ির লোকজন অতটা ভাগ্যবান ছিল না:
সর্বপ্রথম এই ব্যাপারগুলো আমার উপলব্ধিতে আসে যেই খবরটা দেখে তা ছিল গুয়েতেমালায় (যারা জানেন না: এটা একটা দেশের নাম, কোন গন্ধযুক্ত শিল্প নহে) হঠাৎ হওয়া একটা বি-শা-ল সিঙ্কহোল। প্রায় ২৫ মিটার চওড়া আর ১০০ মিটার গভীর গর্ত এটা। এটার গভীরতায় দুইটা স্ট্যাচু অব লিবার্টি লম্বাভাবে এটে যাবে এর ভেতরে।
আমাদের দেশেও ঢাকা শহর প্রতি বছর একটু একটু করে ডুবতেছে সেটা মাহফুজ খান (অতিথি) ভাইয়ের একটা পোস্টে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এছাড়া পত্র পত্রিকায়ও মাঝে মাঝে কোনো কোনো এলাকা ৮/১০ ফুট দেবে যাওয়ার খবর দেখি - মূলত আশেপাশে নদী বা জমি থেকে মাত্রাতিরিক্ত বালু আহরন করার ফলে ফাঁকা জায়গা পেয়ে উল্লেখিত জমির নিচের বালুগুলো ঐদিকে ধুয়ে যাওয়ার ফলেই এমন দেবে যায় (রাস্তার গর্তের মত)। এছাড়া খনি এলাকার আশেপাশেও জমি দেবে যাওয়ার সহজবোধ্য খবরও দেখি।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভুমিকম্পে দেবে যাওয়ার আশঙ্কা। ভূমিকম্পের সময় কায়দামত চাপ উৎপন্ন হলে পায়ের তলের মাটিও চোরাবালির মত আচরণ করে। এটার টেকনিক্যাল নাম সয়েল লিকুইফ্যাকশন। এমন হলে বিল্ডিং মাটিতে গেড়ে যায়, ডুবে যায়। জাপানের নিগাতার এই ছবিটা উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া - ভবনগুলোর একদিক অমন ভাবে ডুবে যাওয়াতে পুরা ভবন কাইত।
এ্যাতদিন পর আবার ফুস করে ডুবে যাওয়ার ভয়টা ফেরৎ এসেছে ভেতরে। প্রতি পদক্ষেপেই একটু ভয়, কখন না ফুস ...
--------------------------------------------------------------------------------------
উইকিপিডিয়ায় সিঙ্কহোল (ক্লিক করুন): পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরটা ৬৬২ মিটার গভীর!!
সিঙ্কহোল কেমনে তৈরী হয় তার সচিত্র বর্ণনা আছে এই লিংকে:
লিংক ১
লিংক ২

গুগলে সিঙ্কহোল লিখে একটা সার্চ দিলে অনেক ছবি দেখা যায়।

0 টি মন্তব্য: