কমোডনামা-২


কমোড দেখেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশে অসম্ভব নয়। আর কমোডের ব্যবহার কিভাবে করতে হয় জানেন না সেরকম লোকেরও অভাব নাই দেশে। তবে কমোড সঠিকভাবে ব্যবহারের তরিকা জানেনা বিদেশেও এরকম লোক পাওয়া যায় বলেই মনে হয়। না না প্রবাসী বাঙালী না, একেবারে প্রথম বিশ্বের আসল এবং খাঁটি বিদেশীর কথাই বলছি। সেজন্যই জাপানে টয়লেটের দরজার ভেতরের দিকে কিংবা কমোডের ঢাকনার উপরে, অথবা টয়লেটের ভেতরে এমন কোন জায়গায় - যেখানে সহজে চোখে পড়ে: এই ছবির মত নির্দেশাবলী দেখতে পাওয়া যায়।


কমোড ব্যবহার না জানা কোন অপরাধ নয়। মায়ের পেট থেকে কেউ এটা ব্যবহার শিখে আসে না, বরং এই জীবনে কোনো না কোনো সময় শিখেছে সবাই। শেখার আগেই এর মুখোমুখি হলে ওজু করার মত সিরিয়াস কাহিনী জন্ম নিতে পারে। আবার "হোটেলে ত্যাগের জায়গা খুঁজে না পেয়ে মোজার মধ্য ইয়ে করে সেটা ছুড়ে বাইরে ফেলতে গিয়ে চলন্ত/ঘুরন্ত ফ্যানে আটকানো এবং দেয়ালে ডিজাইন' -- এই টাইপের গন্ধযুক্ত কাহিনীও জন্ম নিতে পারে; কিংবা, চড়ে বসে পা পিছলে ভেতরে পড়ে যাওয়া, চড়তে গিয়ে কমোড ভেঙ্গে ফেলা, চড়তে সফল কিন্তু এইম করতে বিফল -- এই ধরণের বিদঘুটে কাহিনী ঘটাও অস্বাভাবিক নয়। তাই আমাদের কমোড ওয়ালা টয়লেটের মধ্যেও এমন সচিত্র ব্যবহার বিধি স্টিকি করা বাস্তবসম্মত চিন্তা। বিশেষত যে সকল জায়গায় কিছু ব্যবহারকারী কাছে কমোড নতুন বস্তু হতে পারে সেখানে এরকম শিক্ষনীয় নির্দেশাবলী লাগানো বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এই মুহুর্তেই এমন জায়গার উদাহরণ মনে পড়ছে: মাঝরাতে কিংবা দুপুরে খাওয়া দাওয়া করানোর জন্য দুরপাল্লার বাস থামে এমন হোটেল/রেস্টুরেন্টে, বড় বড় শপিং সেন্টারের টয়লেট, বিভিন্ন জেলা শহরে আবাসিক হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট।

নতুন কাউকে এক কথায় কমোডের ব্যবহারের তরিকা জানাতে চাইলে এক কথায় বলা যায়, ছোট বাচ্চাদের টয়লেট করার জন্য যেমনভাবে ওদের পটি ব্যবহার করানো হয়, কমোডে বড়রা ওভাবেই কাজ করে। জাপানের এয়ারপোর্টগুলোতে কিংবা শপিং সেন্টারে কোনো কোনো পাবলিক টয়লেটের ভেতরে কিভাবে কমোড ব্যবহার করতে হবে সেটার একটা হাইজিন গাইডলাইনও দেয়া থাকতো। যেমন কোথাও কোথাও পাশে এন্টিসেপ্টিক জেল দেয়া থাকতো। সেই জেল একটা টিস্যূ পেপারে নিয়ে কমোডের সিটটা মুছে তারপর ব্যবহার করার নির্দেশাবলী দেয়া দেখেছি। আবার কোথাও পাশের ঝুলানো জায়গা থেকে কমোডের সিটের উপর দেয়ার জন্য আতিকায় মালা আকৃতির টিস্যূ দেয়া থাকতো। বসার সময় সরাসরি সিটের উপর না বসে টিস্যূ বিছিয়ে বসতে হয়, আর কাজ শেষে ওটাও ফ্লাস করে বাই বাই করতে হয়। এতে চর্মরোগ বা অন্য কোনো ধরণের ইনফেকশন কমোডের রিমের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়া রোধ হতে পারে। দেশেও সবসময় কমোড, বিশেষত অফিসে বা শপিং বা অন্য কোথাকার বারোয়ারী কমোড ব্যবহারের সময় ওর সিট বরাবর টিস্যূ পেপার বিছিয়ে নেই সকলে।

কেউ কেউ বলেন কমোডের ভেতরের পানি ছিটকে এসে গায়ে লাগে যেটা আপত্তিজনক। এটা ঠেকানোর বুদ্ধি পেয়েছিলাম আমার বসের কাছ থেকে। উনি কাজ শুরুর আগে সিট বরাবর টিস্যূ বিছানোর পর কিছু টিস্যূ আবার কমোডের পানিতে ফেলেন। এতে পরবর্তীতে পানি ছিটকে আসতে পারে না।

চরম উন্নত দেশ জাপানে এধরণের নির্দেশাবলী দেখে অবাক হলেও কারণটা জানলে অতটা অবাক হবেন না। জাপানে সাধারণত সবজায়গাতেই প্যান জাতীয় টয়লেট ব্যবহৃত হয়। তবে সেই প্যান বলতে আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত প্যান বুঝলে ভুল হবে। জাপানীরা সব দিকেই ইউনিক। তাই প্যানগুলো এবং এটা ব্যবহারের তরিকাও ইউনিক (কমোডনামা-১ এ লিখেছিলাম কিছুটা)। দেখুন নিচের ছবি আর নির্দেশাবলী দেখে এটার অভিনবত্ব কিছুটা আঁচ করতে পারেন কি না।




এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন ওখানে কমোড ব্যবহারের নির্দেশাবলী জরুরী হতে পারে। তবে আমাদের দেশেই সাধারণ প্যান জাতীয় টয়লেট ব্যবহারের মূল কারণ বা রহস্য অনেকেরই অজানা, যা ফিল্ড লেভেলে কাজ করতে গিয়ে ভালভাবেই টের পেয়েছিলাম। আবার এমন কাহিনীও জানি, যে চাচা মিয়াকে স্যানিটারী ল্যাট্রিন ব্যবহারের কথা জিজ্ঞেস করতেই ভাবের উত্তর "এ্যাঁ! আমারে কি অত বোকা পাইছো যে এ্যাত সুন্দর বনজঙ্গল ছেড়ে ঐ ঘুপচির মধ্যে ইয়ে করতে ঢুকবো!' কাহিনী তো এখানেই শেষ না, আমার কাজের সুপারভাইজার অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং ভাল ছাত্র ছিলেন। কিন্তু উনিই আমি জয়েন করার কিছুদিন আগে এক বাসায় গিয়ে টয়লেটের পাইপে পানি জমে আছে দেখে সেটা লাঠি দিয়ে গুতিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন!! অবশ্য এতে ওনার দোষ খোঁজা ঠিক না, কারণ বাসার টয়লেটের প্যানের পাইপের নিচের দিকে যে পানি জমা থাকে, সাধারণত: কেউই সেটা তদন্ত করে দেখে না, আর স্কুল বা কলেজ লেভেলে সকলের পাঠ্য কোনো বই পুস্তকেও স্যানিটারী ল্যাট্রিন কেন স্যানিটারী বা স্বাস্থ্য সম্মত সেটার ব্যাখ্যা দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

খোলা জায়গায় ইয়ে করলে সেটা দুর্গন্ধের জন্য যেমন অস্বাস্থ্যকর তেমনি এটা থেকে বিভিন্ন পোকামাকড়, কিংবা পশুপাখি বা সরাসরি কোন মাধ্যমে ক্ষতিকর অসুখ বিসুখ সৃষ্টিকারী জীবানু অন্য মানুষকে সরাসরি বা খাবার সংক্রমিত করে অসুস্থ করতে পারে। তাই খোলা জায়গার বদলে গর্ত করে সেখানে ইয়ে করলে কিছুটা রক্ষা। এতে পশু বা সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার (পায়ের তলায় পরা, হোঁচট বা পিছলিয়ে এর উপর পতিত হওয়া ইত্যাদি আরকি) সম্ভাবনা বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্বেও পোকামাকড় (মাছি ইত্যাদি) সেখান থেকে জীবানুবাহক হতেই পারে, আর দুর্গন্ধের কথাও সহজে ভুলে থাকা মুশকিল। তাই এর হাত থেকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত সহজ একটা পদ্ধতি হল পানি'র তালা বা ওয়াটার সিল। যার মূল অংশ হল ইংরেজী U অক্ষরের মত আকৃতির একটা পাইপ যাতে পানি ভর্তি করা থাকে। এর এক দিক ইয়ে করার দিকে আর আরেকদিক থাকে মলমূত্র জমা হওয়ার স্বাস্থ্যসম্মত গর্তে। স্বাস্থ্যসম্মত গর্ত হল এমন এক গর্ত যেখান থেকে পোকামাকড় বের হওয়ার কোন রাস্তা থাকে না ফলে ওগুলো মলমূত্রের জীবানু বহন করে এসে ভিলেনগিরী করতে পারে না। ঐ গর্তের গন্ধ এবং অন্য গ্যাস বের হওয়ার জন্য একটা লম্বা পাইপ দেয়া থাকে যার মাথা অনেক উঁচুতে থাকে এবং সেদিক দিয়ে পোকার আসা যাওয়া ঠেকাতে মশারী দেয়া থাকে, বৃষ্টির পানি আসা আটকানোর ব্যবস্থা থাকে। কাজেই ঐ পথে বাতাস ছাড়া কিছু আসা যাওয়া করতে পারে না।

তাহলে মলমূত্র এই গর্তে ঢোকে কিভাবে? উত্তর হল ডুব সাঁতার দিয়ে। ঐযে ওয়াটার সিল আছে সেটার একপাশে ইয়ে এসে পানিতে পড়ে তারপর এদিক থেকে আরও পানি ঢাললে তার ধাক্কায় ময়লাটা U এর নিচের দিকে ডুব দিয়ে অপর বাহু দিয়ে বের হয়ে গর্তের মধ্যে পরে। কিন্তু যতই ডুব সাঁতার দিক, স্বাভাবিক অবস্থায় এর মধ্যের পানি শুকানোর কোনো উপায় নাই। ফলে ইধারকা মাল উধার করতে ডুব সাঁতার ছাড়া উপায় নাই। আমরা পানি ঢেলে বা ফ্লাশ করে ইধারকা মাল (মল) উধার করলেও উধারের পোকামাকড় ডাইভ দিয়ে ডুব সাতারের পর ইধার আসতে তেমন একটা উৎসাহ কিংবা সাহস পায়না, তাই পোকামাকড় পুরাপুরিই ভিলেনী করার সুযোগবঞ্চিত থাকে। আর উধারের গন্ধও ইধারে আসা ঠেকিয়ে দেয়া হয় এভাবে। নিচের ছবিটা দেখলে অতি পরিচিত প্যানের মধ্যে সেই ওয়াটার সিলের ব্যবহারটা বুঝতে পারা সহজ হবে।




তবে আমরা যতই নিচু প্যানওয়ালা টয়লেটে অভ্যস্থ হই না কেন কমোড অনেক বেশি আরামদায়ক, কারণ এতে প্যান পদ্ধতির মত হাটু মুড়ে বসতে হয় না। তাইতো হতদরিদ্রদেরকেও কম বাজেটে কমোড বানানোর তরিকা জানিয়ে বই পত্তর পাওয়া যায়। নিচের ছবিগুলো একটা বই থেকে নেয়া। দেখছেন কারবার, ওখানে কিন্তু এই টয়লেটগুলোর নিচে ওয়াটার সিল (বা ট্র্যাপ / Trap) নাই। তবে এরকম করে কমোড বানিয়ে সেখানে ইচ্ছা করলেই লাগিয়ে নেয়া যায়।


উপরের ছবিগুলো আফ্রিকা মহাদেশের কোন এক দেশের একটা প্রজেক্টের ছবি। আমাদের দেশে ঝোপ ছেড়ে ছোট ঘরে ঢুকতে চায়না - এমন ব্যক্তি আছে তা তো আগেই বলেছি। আবার অনেকেই কমোডের পটি সিস্টেমের সুখের চেয়ে আগের পরিচিত পদ্ধতি ব্যবহার করতে চায়। এখন উভয় পক্ষকে খুশি রাখার জন্য এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টার অন্ত নাই। তাইতো নিচের ছবির মত হাইব্রীড সিস্টেম বানিয়েছে। প্যান আর কমোড দুই ধরণের ব্যবহারকারীই এটাতে ত্যাগের সুখ লাভ করতে পারবেন!


আমি জাপানে যেই এ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম ওখানকার কমোড ছিল নিচের ছবির মত। পানির কল বা স্প্রে না থাকলে কি হবে, হাত ধোয়ার জায়গা আছে!! টেকনোলজি হিসেবে চিন্তা করলে এটা আহামরি কিছু না। ফ্লাশ করার পর পানি ভেতরেই পরতো, সেটাকেই অতিরিক্ত পাইপ যুক্ত করে বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে।


টিস্যূ পেপার দিয়ে আমার হয় না, তাই  টয়লেটে ব্যবহারের জন্য গোছলখানা থেকে একটা লম্বা পাইপ দিয়ে স্প্রে (হ্যান্ড শাওয়ার) লাগিয়ে নিয়েছিলাম। দেশের কমোডের সাথে হ্যান্ড শাওয়ার কিংবা বদনার ব্যবস্থা থাকে, যেটা জাপানে খুব মিস করতাম। আমার ধারণা আরো অনেক লোকই এই ব্যাপারটা মিস করতো, তাই অতীতে বিডেট বা বিডে নামক ধৌতকরার এক প্রকার কমোড মূল কমোডের পাশাপাশি ব্যবহার ব্যবহার করা হয়। এটা মূলত ফরাসী আবিষ্কার, তবে বাংলাদেশেও দুই এক জন এমন সিস্টেম করেছে এমন কথা শুনি ডেভেলপারদের কাছ থেকে।

না না ভয় পাওয়ার কিছু নাই। এক জায়গায় ত্যাগ করে আরেক জায়গায় উঠে এসে ধৌত করতে হবে না। বর্তমানে একেবারে মনমত টু-ইন-ওয়ান বিডে টয়লেট পাওয়া যাচ্ছে। সত্যি বলতে কি এই বিডেগুল আমি এখনও খুব মিস করি। বেশি ব্যাখ্যার দরকার নাই ছবি দেখেন। কাজ শেষে সুইচ টিপলেই একটা পাইপ বের হয়ে গরম পানির ধারা দিবে। এই পানির গতি, তাপমাত্রা কিংবা নজেলের প্রকৃতি সবই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


সাধারণ কমোডের উপরের সিটটাকে পাল্টিয়ে নিয়ে ওটাকেই এই ধরণের বিডে টয়লেটে পরিবর্তন করা যায়। এটা লাগাতে ফ্লাশ ট্যাংকের জন্য থাকা পানির লাইন আর একটা ইলেক্ট্রিক পাওয়ার লাইন লাগবে।


২০০১ সালে সুইজারল্যান্ডে একবার ইউরোপের খ্যাতনামা Geberit কম্পানির কারখানায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো শিক্ষা সফরে। সেখানে প্রথম এই রকম অত্যাধুনিক বিডে দেখেছিলাম। তবে ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছে আরো কয়েকবছর পরে জাপানে। জাপানে উল্টা প্যান দেখে যা কিছুই ভাবেন না কেন, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় বাথরুম ফিটিংস কারখানা Toto কিন্তু জাপান থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলো (১৯১৭ সালে)।

ছবি সংগ্রহের সূত্রসমূহ:
http://www.asianjoke.com/wp-content/uploads/2009/07/japanese-toilet-signs-and-rules-in-japan.jpg
http://farm5.static.flickr.com/4114/4916207630_96026d602e_o.jpg
http://dadsprimalscream.files.wordpress.com/2011/03/japanese-toilet.jpg
http://dadsprimalscream.files.wordpress.com/2011/03/toilet.jpg
http://www.mikesblender.com/how%20to%20use%20japanese%20toilet.jpg
http://www.spaciousplanet.com/images/world/thumbnails/japanese-bidet12726607892591.jpeg
http://gallerydejavu.com/wp-content/uploads/2011/10/japanese-toilet.jpg
http://en.wikipedia.org/wiki/Bidet
http://donkeymon.net/donkeymon/images/galleries/Life%20in%20Japan/05-toilet.jpg
http://www.toddswanderings.com/wp-content/uploads/2010/12/Japanese-Toilet.jpg
http://www.ecosanres.org/pdf_files/ToiletsThatMakeCompost.pdf
http://en.wikipedia.org/wiki/Flush_toilet
http://outsiderjapan.pbworks.com/f/1297364772/Bidet2.jpg
http://www.terrylove.com/fh.htm
http://helid.digicollection.org/en/d/Jh0210e/3.3.6.html
http://www.totousa.com/WhyTOTO/AboutTOTO/History.aspx
http://green-living-made-easy.com/toto-toilets.html

সবুজ ছাদ বা Green Roof

ছাদের উপরে বাগান করা নতুন কোন বিষয় নয়। তবে সবুজ ছাদ বা গ্রীন রুফ বলতে এই বাগান করার বিষয়টাকে দুই একটা টবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটা বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বুঝানো হয়ে থাকে। উইকিপিডিয়া অনুসারে একটা ভবনের ছাদ পুরোপুরি বা বা কিছু অংশ পানি নিরোধী আবরণের উপরে বৃদ্ধি উপযোগী কোন মাধ্যমে জন্মানো গাছপালা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকলে একে green roof বা সবুজ ছাদ বলা হয়। এটার মধ্যে শিকড় প্রতিরোধী স্তর, পানিনিষ্কাশন স্তর ও সেঁচ দেয়ার জন্য স্তরও থাকতে পারে। 'সবুজ' কথাটা দিয়ে ছাদের মেঝের টাইল বা আস্তরে কখনো কখনো ব্যবহৃত সবুজ রংকে বোঝানো হয় না বরং এ দ্বারা প্রকৃতি বা পরিবেশ বান্ধবতাকে বুঝানো হয় - তাই, ছাদের উপরে কৃত্রিম পুকুরে বাসার পয়ঃপ্রণালীর পানি পরিশোধন করাটাও সবুজ ছাদের একটা প্রকারভেদ হতে পারে।

সিঙ্গাপুরের Nanyang Technological University ক্যাম্পাসে সবুজ ছাদ (source: http://www.vitodibari.com)


সবুজ ছাদ বলতেই ছাদের উপরে পাতলা স্তরে মাটি ফেলে কিংবা অন্য উপায়ে মাটি দিয়ে বাগান করা বুঝালেও আমার মনে প্রথমেই যেই ভাবনা আসে সেটা হল মরিচ, করল্লা, লাউ ইত্যাদি সব্জীর কথা। ছাদে এরকম অর্থনৈতিক ভাবে সরাসরি লাভজনক কাজ করা যায় বেশ ভালভাবেই। ইচ্ছা করলে এর ওর বাসায় পাঠানো যায়, বিক্রয়ও করা যেতে পারে। মরিচের বাজারে আগুন লাগলে ছাদে লাগানো মরিচ গাছ থেকে হাত বাড়িয়ে মরিচ নিয়ে রান্না করবেন - খুবই আনন্দের কথা। কিংবা কারো কারো মত ড্রামে আমগাছও লাগানো যেতে পারে।

আরে থামেন থামেন। তরিতরকারী চাষের আর আলু পটলের গল্প ফাঁদার জন্য গ্রীন রুফ বা সবুজ ছাদ নিয়ে পোস্ট দিতে আসিনি। বর্তমানে পরিবেশ প্রকৌশল এবং ভবন নির্মান ও স্থাপত্য বিদ্যায় সবুজ ছাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি কোথাও কোথাও (যেমন টরন্টো, কানাডা) সবুজ ছাদ করা নিয়ে আইনও তৈরী হয়েছে, সবুজ ছাদ করলে বিভিন্ন ভর্তূকী এবং পরিবেশবান্ধব ভবনের সার্টিফিকেটও পাওয়া যায় আমেরিকা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আলু-পটল ছাড়াও এইটা নিয়ে মাতামাতির অন্য কারণগুলো একটু একটু করে এখানে বলার চেষ্টা করি। তবে কারণ বলার আগে এটার ফলে ভবনে কী পরিবর্তন করতে হবে সেটা বলে নেই -- না বললে কারণসমূহ পড়ার সময়েই ওগুলোর দুশ্চিন্তা মাথায় কুটকুট করতে থাকবে হয়তো।

জাপানের ফুকুওকার একটা ভবনে সবুজ ছাদ

ছাদের উপরে মাটি তুলে তাতে চাষবাস বা বাগান করলে তা ভবনে অতিরিক্ত ভার দেবে। হ্যাঁ এই ওজনটা হেলাফেলা করে অবহেলা করার মত না। আমরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ পুরাতন নিয়মে বাসাবাড়ি বা ভবন নকশা করার সময়ে কাঠামোর নিজের ওজন ছাড়াও প্রতি বর্গফুটে ৪০ পাউন্ড নড়নচড়নশীল ওজন (লাইভ লোড) ধরে হিসাব কিতাব করি।  এই ওজনটা হল আদমের ওজন  + আদমদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের ওজনের জন্য। তবে স্কুল, কমিউনিটি হল, লাইব্রেরী, মসজিদ, বাসার সিড়ি এসবে এই লাইভ লোড ধরি ১০০ পাউন্ড/বর্গফুট (psf) --- বুঝতেই পারছেন এসব জায়গায় অনেক বেশি আদম জড়ো হবে + নড়াচড়া করবে - তাই অতিরিক্ত সতর্কতা। মাটির ওজন হল প্রতি ঘনফুটে ১১০ পাউন্ড -- এটা অবশ্য ভাল ভাবে দুরমুজ করে জমাট বাধানো (কম্প্যাক্ট করা) মাটির জন্য। গাছ লাগানোর মাটি হালকা ঝুরঝুরা থাকবে, পিটিয়ে শক্ত করা ঘন মাটি হবে না, তাই ছাদে ১ ফুট গভীরতার মাটি ফেললে অতিরিক্ত ওজন আসবে ১১০ পাউন্ড/বর্গফুটের চেয়ে কিছুটা কম। এর সাথে সেচের পানির ওজন, পানিরোধী আবরণ স্তরের ওজন, শিকড় বিকর্ষণকারী স্তর, এবং ড্রেনেজ স্তরের জন্য সামান্য অতিরিক্ত কিছুটা ওজন যুক্ত হতে পারে। কাজেই বেশি পরিমান মাটি ফেলে সারা ছাদকে বাগান বানাতে চাইলে ভবন নকশার সময়েই ছাদে অতিরিক্ত ওজন বহনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আবশ্য যদি ৩ ইঞ্চি মাটি দেই তাহলে প্রায় ২৮ পাউন্ড/বর্গফুট ওজন আসবে, যা আগের তৈরী ভবনের ছাদেও সমস্যা করবে না বলে আশা করা যায় (৩ ইঞ্চি মাটিতে মরিচ করল্লা ছাড়াও আরও অনেক রকম গাছ হতে পারে :-) )। কাজেই ছাদের উপরে পলিথিন কিংবা পীচ/আলকাতরা ঢেলে পানিরোধী ক্ষমতা বাড়িয়ে তারপর মাটি দিয়ে বাগান প্রজেক্ট শুরু করা যেতে পারে। মাটি ফেলেই যে করতে হবে এমন কথা নাই। গায়ে গায়ে লাগানো টব কিংবা চ্যাপ্টা ট্রে টাইপের আধারে মাটি নিয়েও এই কাজ করা যাবে। তবে ছাদের উপর টবে বাগান করলে সেটাকে সত্যিকার সবুজ ছাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, যদিও এটা একটা বিতর্কের বিষয়।

দুই প্রকারের সবুজ ছাদ আছে: নিবিড় ছাদ (intensive roofs) এবং বিস্তৃত ছাদ (extensive roof); নিবিড় ছাদে উদ্ভিদের পরিমান বেশি হয় এবং এটা এটাতে বহু প্রকার উদ্ভিদ জন্মাতে পরে, তবে এরকম ছাদের অধিক পরিমান পরিচর্যার দরকার হয়, অপরপক্ষে বিস্তৃত ছাদে হালকা ঘনত্বের গাছপালা থাকে এবং এটার মাটি নিবিড় ছাদের চেয়ে কম গভীরতা সম্পন্ন।

পূর্বে প্রস্তুত করা ট্রে পদ্ধতিতে খুব সহজে সবুজ ছাদ তৈরী করা যায়
আরো পাতলা স্তরের মাটিতে ম্যাটের মধ্যে সামান্য মাটিতে টিকতে পারে এমন উদ্ভিদও লাগানো যেতে পারে

যারা এখনও আমার চাপাবাজিতে আশ্বস্থ হতে পারেননি বিশেষত তাদেরকে চিপা দিয়ে একটা কথা বলি: পৃথিবীতে বেশ অনেক ভবনে, বিশেষত বড় হোটেলের ছাদে সুইমিং পুল আছে। সেইরকম একটা পুল তৈরী করতে চাইলে প্রতি ফুট গভীর পানির জন্য ৬২.৪ পাউন্ড/বর্গফুট করে ওজন যুক্ত হবে (পানির ঘনত্ব = ৬২.৪ পাউন্ড/ঘনফুট)। বেশি না মাত্র গলা সমান বা ৫ ফুট গভীর পুল করলেই সেক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটে ৩১২ পাউন্ড লাইভ লোড ধরে নকশা করতে হয় :-) ।

এবার আসি সবুজ ছাদের সুবিধার কথায়।
সবুজ ছাদ ব্যবহার করলে ছাদের আয়ু নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। কারণ, এর উপরে পানিরোধী স্তর সহ বিভিন্নরকম কেরামতি করা হয়। তাই আবহাওয়ার প্রবল দুষ্টু থাবা থেকে এটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে। ফলে ছাদ মেইনটেনেন্সের খরচ কমে যায়। এছাড়া এরকম সৌন্দর্য বর্ধনের ফলে স্থাপনার সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি পায়।

সবুজ ছাদ ব্যবহার করা হলে তা একেবারে উপরের তলার ঘর ছাদের কারণে অতিরিক্ত গরম হওয়া রোধ করে। কারণ নাঙ্গা ছাদের কংক্রিটে যখন সূর্যের তাপ এসে পড়ে, সেই তাপ কংক্রিট শোষণ করে এবং প্রায় পুরাটাই আবার নিচের দিকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু গাছপালা সূর্যের তাপ পুরা শোষণ করে, সেই তাপ ব্যবহার করে নিজের সালোকসংশ্লেষন করে পাতার পানি বাষ্প আকারে বাতাসে ছেড়ে দেয়, তাই এক ফোটা তাপও গাছ ভেদ করে নিচের দিকে আসতে পারে না। যদি আসেও সেটা আবার মাটিতে থাকা পানিকে বাষ্পীভবনে ব্যয় হয়। ফলে উপরের ছাদ অন্য তলার ছাদের মতই ঠান্ডা থাকে।

উন্মুক্ত ছাদের এই গরমের অসুবিধার কারণেই টপ ফ্লোরগুলো অন্য ফ্লোরের মত কেউ কিনতে বা ভাড়া নিতে চায় না। এমনকি  জলছাদ দেয়ার পরেও গরমের আশংকায় টপ ফ্লোর কেউ ভাড়া নিতে বা কিনতে চায় না। ফলে বাধ্য হয়ে ডেভেলপারকে ঐ ফ্লোর কম দামে বিক্রয় করতে হয়। কিন্তু সবুজ ছাদ করলে সৌন্দর্যের কারণে সামগ্রীক ভবনের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি টপ ফ্লোরের গরমও থাকে না - মূলত এই কারণেই এখনকার ডেভেলপারগণ ভবনের নকশা করার সময়ই ছাদে বাগান করার ব্যবস্থা করে।

কম পরিমানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ দরকার হয়, এর ফলে শতকরা ৫০ থেকে ৯০ ভাগ কম শক্তি খরচ করতে হয়। সবুজ ছাদ করলে এই অতিরিক্ত ক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের স্থাপনা খরচ লাগে না - তাই ছাদ ও বাগান করার অতিরিক্ত খরচটা এখানেই পুষিয়ে যায়। সবুজ ছাদ করতে প্রতি বর্গমিটারে ২০ - ৪০ ডলার খরচ হয় বলে বিভিন্ন জায়গায় লিখেছে। আমাদের দেশের ডেভলপারদের করা সবুজ ছাদে এই খরচ আসে আরো অনেক কম (প্রায় ৭৫০ টাকা /বর্গমিটার)। তাহলে ব্যক্তিগত লেভেলে হিসাবটা এমন হতে পারে -- আমার বেডরুমের আকার প্রায় ১২ বর্গমিটার (১ বর্গমিটার = ১০.৭৬ বর্গফুট)। এটার উপরে সবুজ ছাদ দিতে খরচ হবে প্রায় ৯০০০ টাকা। ১.৫ টনের এসির বদলে ১ টনের এসি কিনতে আমার কমপক্ষে ৯০০০ টাকা সাশ্রয় হলে সবুজ ছাদ করা সৌন্দর্যের মূল্য বাদেই সরাসরি লাভজনক। আর কম ক্ষমতার তাপানুকুল যন্ত্রের কারণে মাসে অন্তত ২০০টাকার বিদ্যুৎ বিল কমে আসবে।

অন্য সুবিধা বলার আগে তাপজনিত আরেকটা সুবিধা জানানো দরকার। শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে তাপ শোষণকারী গাছের অভাবে এবং গাড়ি এবং ঘরের এয়ার কন্ডিশনার ও অন্য যন্ত্রপাতির কারণে আশেপাশের গাছপালাওয়ালা এলাকার চেয়ে তাপমাত্রা বেশি হয়। ঢাকার রাস্তায় শাহবাগ থেকে ফার্মগেট এলাকা পার হয়ে রোকেয়া সরনী কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকলেই এই কথার সত্যতা চামড়ার অনুভূতিতেই টের পাওয়া যায়। শহরের কেন্দ্রে এভাবে আশেপাশের অঞ্চল থেকে ৩ থেকে ৯ ডিগ্রী পর্যন্ত তাপমাত্রা বেশি হতে পারে - যাকে তাপদ্বীপ প্রতিক্রিয়া বা Heat Island Effect বলা হয়। সবুজ ছাদ এই তাপদ্বীপ হওয়া থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষত যদি ছাদের বাগানটিকে কাঁচে দিয়ে আবৃত করা যায় তবে এটা একটা পরোক্ষ সৌরশক্তি সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করে। শহরের কোন এলাকায় এমন সবুজ ছাদের সংখ্যা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে তা গ্রীষ্মকালে শহরের গড় তাপমাত্রা কমিয়ে দিতে পারে।

ব্রাড ব্যাস (Brad Brass) ২০০৫ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গবেষণায় দেখান যে সবুজ ছাদ ব্যবহারের ফলে শীতকালেও ঘর থেকে তাপ হারানোর হার কমে যায় ফলে শীতে ঘর গরম রাখতেও কম শক্তি খরচ করতে হয়। এছাড়া সবুজ ছাদ ও গাছপালা ভবনকে শব্দনিরোধী করতে সাহায্য করে; মাটি নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ আটকায়, উদ্ভিদ উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ আটকায়।

এরকম ছাদ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পরিমান কমিয়ে দেয়। পানির অনেক অংশই মাটিতে ও গাছে রয়ে যায়। আর মাটির মধ্য দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে ড্রেনেজে আসলেও তাতে উন্মুক্ত ছাদে পতিত হয়েই গড়িয়ে আসার চেয়ে সময় লাগে অনেক বেশি। ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের নালায় কম চাপ পড়ে। ফলে হঠাৎ ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট শহুরে জলাবদ্ধতা কম হয়। এছাড়া এই উদ্ভিদ ও মাটির বাধা বৃষ্টির পানি থেকে ভারী ধাতু এবং দূষনকারী পদার্থসমূহকে পরিশ্রুত করে। গাছপালা বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষন করে অক্সিজেন দেয়। এছাড়া ঘন সন্নিবেশিত গাছের পাতাগুলোতে ধূলাবালি থিতানোর জায়গা পায়, ফলে তা দূষনকারী পদার্থসমূহকে পরিশ্রুত করে, যা হাঁপানীর মত রোগ হওয়ার হার কমাতে সাহায্য করে।

ঠিকভাবে স্থাপন করা হলে জীবিত ছাদ ভবনকে LEED পয়েন্ট পাইয়ে দিতে পারে। (LEED এর সম্পুর্ন নাম Leadership in Energy and Environmental Design - এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সবুজ ভবন সার্টিফিকেশন পদ্ধতি। যুক্তরাস্ট্রের সবুজ ভবন কাউন্সিল - U.S. Green Building Council বা USGBC, ২০০০ সালের মার্চ মাসে এই পদ্ধতিটি উন্নয়ন করেন। LEED ভবন মালিক এবং পরিচালনাকারীদেরকে ভবনকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য পরিমাপযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত উপায়গুলো চিহ্নিত এবং সংশোধনের জন্য নকশা, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার একটা সুনির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত নির্দেশনা দেয়।)।

"সবুজ ছাদ' দ্বারা সবুজ বা পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এমন ছাদকেও বুঝানো হয়ে থাকতে পারে; যেমন ঠান্ডা ছাদ, যেই ছাদে সৌরশক্তি সংগ্রহের জন্য সৌরকোষ বা সোলার প্যানেল ব্যবহার করা হয়। সবুজ ছাদকে আরও কয়েকটা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে যেমন: eco-roofs, oikosteges, vegetated roofs, living roofs, greenroofs and VCWH[1] (Horizontal Vegetated Complex Walls)। সবুজ ছাদ একটা স্বনির্ভর ভবনের অন্যতম প্রধান অংশ।

সবুজ ছাদ তৈরী করলে কৃষিভূমি বৃদ্ধি পায়। ছাদে ফুল, ঘাস লাগানো ছাড়াও বিভিন্ন তরি তরকারীও এবং ফসল ফলানো যায়। যা উপরে উল্লেখিত সুবিধাগুলোতে আরো নতুন মাত্রা যোগ করে। 

বিশ্বাস করা মুশকিল যে এটা কিছুর ছাদ
সবুজ ছাদের আরেকটা বিরাট উপকার হল এটা কীটপতঙ্গ ও অন্য প্রাণীদের প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র বা আবাসভূমি তৈরী করে। ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সবুজ ছাদে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর প্রাণী টিকে থাকতে পারে। ফলে জীববৈচিত্র বৃদ্ধি পায়। বিশেষত নগরায়ণের ফলে বিভিন্ন পশু, পাখি, কীট পতঙ্গের আবাসস্থল যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তার অনেকটাই সবুজ ছাদের সাহায্যে পুনস্থাপন করা সম্ভব। প্রাণী ও কীটপতঙ্গের উপস্থিতি আমাদের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরী বিষয়। তাই সবুজ ছাদ হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতেও ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। কাকের পাশাপাশি কোকিলের ডাক, ঘুণের শব্দের পাশাপাশি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ফেরত পেতে সবুজ ছাদ হতে পারে একটা ভাল উপায়।

তথ্য ও ছবির সূত্রসমূহ এবং সংশ্লিষ্ট কিছু লিংক:
উইকিপিডিয়া: http://en.wikipedia.org/wiki/Green_roof
http://www.greenroofs.com/Greenroofs101/
http://www.greenroofs.org/
http://www.toronto.ca/greenroofs/
http://www.greenroof.se/

বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট


যানজট বা যাতায়ত ব্যবস্থাপনায় বাস সবসময়ই প্রাইভেট কারের চেয়ে বেশি আদরনীয় কারণ, একই সংখ্যাক যাত্রী বহন করার জন্য যতগুলো বাস লাগে সেগুলোর বদলে কার ব্যবহার করলে তা অনেক বেশি রাস্তা দখল করে যানজট বাড়ায়। যেমন: ১২০ জন যাত্রী বহন করতে ৩০টা কার কিংবা ৩টা বাস লাগবে। ৩০টা প্রাইভেট কারের চেয়ে ৩টা বাস রাস্তায় এবং পার্কিংএ অনেক কম জায়গা নেয়। এছাড়া জ্বালানী খরচের কথা চিন্তা করলেও ৩০টা কারের চেয়ে ৩টা বাসে চলাচল করা সাশ্রয়ী। তাই সীমাবদ্ধ আকারের রাস্তা দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা পেতে/দিতে ট্রাফিক ম্যানেজারগণ প্রাইভেট কারের বদলে বেশি বেশি বাস চান। এছাড়া একটা পাবলিক বাস সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরা সময়েই যাত্রী বহন করে। কিন্তু প্রাইভেট কার দুই বা তিন ট্রিপ দেয় আর বাকী সময়ে রাস্তার জায়গা দখল করে থেমে থাকে (পার্কিং)।

কিন্তু ট্রাফিক ম্যানেজার চাইলেই তো হবে না। বাসে খরচ অনেক কম হলেও সেটাই বাসে চড়ার জন্য যথেষ্ট ভাল কারণ নয়। আরো অনেক কারণেই মানুষ বাসে না চড়ে অধিক খরচ করে প্রাইভেট কার ব্যবহার করে। সময়মত বাস না পাওয়ার সমস্যা যেমন রয়েছে (অপ্রতুলতা), তেমনি সাধারণ বাসে যাতায়ত কম আরামদায়ক (গরম, ধূলাবালি), সময়ও অনেকসময় বেশি লাগে। বাস আকারে বড় হওয়াতে এটা প্রাইভেট কারের মত সহজে এঁকে বেঁকে বিভিন্ন বাঁধা পার হয়ে দ্রুত যেতে পারে না। মানুষ প্রাইভেট কার বাদ দিয়ে বাসে চড়তে আগ্রহ পাবে যখন এটা দিয়ে আরামে এবং দ্রুততর গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

এমন যদি হত, যে আমি সকালে বাসা থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডে গেলাম এবং টিকিট কেটে অপেক্ষায় থাকলাম। লাইনে প্রায় ১০ জনের পেছনে দাঁড়াতে হল। ৫ মিনিটের মধ্যে বাস আসলো। হুড়হুড় করে সকলে গাড়িতে উঠলাম। বাস এসে থামা থেকে আমাদের নিয়ে আবার চলতে শুরু করার পুরা ঘটনাটায় সর্বমোট ৩০ সেকেন্ড সময় লাগলো। বাসটা এয়ার কন্ডিশনড, কোনরকম ঘাম, ধুলাবালি নাই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এটা কোন জ্যামে পড়ছে না, সিগনালেও এটাকে আগে ছেড়ে দিচ্ছে। রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকলেও বাসটা এর জন্য নির্দিষ্ট করা আলাদা লেন দিয়ে সমস্ত জ্যামকে পাশ কাটিয়ে সাবলিলভাবে চলে আসলো। মিরপুর থেকে মতিঝিল আসতে ৩০ মিনিট লাগলো। বাসা থেকে বের হয়ে স্ট্যান্ডে আসা, টিকিট কাটা, অপেক্ষা, বাস ভ্রমন, বাস স্ট্যান্ড থেকে অফিসে আসা সব মিলিয়ে আমার ৫৫ মিনিট সময় লাগলো। ওদিকে আমার বন্ধু একই পথ জ্যাম ঠেলে প্রাইভেট কারে আসতে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা লাগলো।

হ্যাঁ ভাই, মেট্রো রেলের এই রকম সুবিধা বাসেও পাওয়া সম্ভব, আর এটা মেট্রো রেলের চেয়ে কম খরচেই করা যায়। পৃথিবীর অনেকগুলো বড় শহরে এই পদ্ধতি দারুন কাজে দিয়েছে। মেট্রোরেলের নাম অনেক জায়গাতেই এমআরটি বা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট - আর এই নাম থেকেই এই পদ্ধতির নাম হয়েছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি।

বিআরটি সিস্টেমে ব্যবহৃত বাসগুলি প্রচলিত বাসের চেয়ে একটু অন্যরকম হয়।

  • প্রথমত, এগুলোর দরজা থাকে বাসের মাঝখানে। দরজার বৈশিষ্ট হল সাধারণ বাসের মত এটার দরজায় কোন সিড়ি নাই। বাসের মেঝে রাস্তা থেকে যথেষ্ট উঁচুতে থাকায় বাসগুলো ট্রেনের মতই এর নির্দিষ্ট স্টপেজে একটা প্লাটফর্ম ঘেষে দাঁড়ায়। স্টপেজের প্লাটফর্ম আর বাসের মেঝে এক লেভেলে থাকাতে বাসের সিড়ি দরকার হয় না, আর এর ফলে খুব কম সময়ে ও কম কষ্টে যাত্রীরা এটাতে উঠা নামা করতে পারে।
  • প্লাটফর্ম থেকে বাসে উঠতে মানে প্রবেশ করতে হয়। এজন্য কোন রকম উঁচু বা নিচু সিড়ি পার হতে হয় না। বাসের দরজা আর প্লাটফর্ম এমনভাবে সমন্বিত থাকে যে হুইলচেয়ারে করেও যে কোন লোককে এটাতে তোলা যাবে।
  • এই বাসের আরেকটি জরুরী বৈশিষ্ট হল এগুলো এয়ার কন্ডিশনড হতে হয়। কারণ আরামদায়ক আর সহজ না হলে মানুষ প্রাইভেট কার বাদ দিয়ে এটাতে ভ্রমন করতে তেমন একটা উৎসাহ পাবে না।
  • সময় বাঁচানোর জন্য বাসের মধ্যে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকে না। কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে হয়।
  • আরেকটি জরুরী বৈশিষ্ট হল, বিআরটি বাসের জন্য রাস্তার মধ্যেই আলাদা করে দেয়া লেন থাকে। ফলে এই বাসগুলো রাস্তার অন্য গাড়িদের সাথে দেখা সাক্ষাত ছাড়াই দ্রুত যেতে পারে। ফলে রাস্তার অন্যান্য গাড়ির চেয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তবে এটা বাধ্যতামূলক কিছু নয়। কোনো কোনো শহরে আলাদা সুড়ঙ্গ করে সেটাতে ট্রেন না করে বিআরটি করা হয়েছে
  • এর ঘন ঘন স্টপেজ থাকে না।
  • ট্রাফিক সিগনালে এই বাসগুলো অগ্রাধিকার পায়। অনেকক্ষেত্রে রাস্তার ক্রসিংগুলোতে শুধু এই বাসের লেনগুলোর জন্য ফ্লাইওভার করে দেয়া হয়।

যেহেতু এই বাসের আলাদা লেন থাকে তাই আসা ও যাওয়ার লেনগুলো রাস্তার মাঝের দিকে হলে সেটা সুবিধাজনক হয়। সেক্ষেত্রে প্লাটফর্ম হয় রাস্তার মাঝামাঝি ডিভাইডারের জায়গায়। ফলে এই বাসগুলোর দরজা উল্টা দিকে হয়। যাত্রীদেরকে ফুটওভার ব্রীজ দিয়ে এই স্থানে আসতে হয়।

এবার এই ধরণের সিস্টেম ও বাসের কিছু ছবি দেখুন:

চীনের একটা শহরের স্কেচ, রাস্তার মাঝে বিআরটি আলাদা লেনে হলে স্টপেজগুলো এমন হতে পারে (স্কেচ সূত্র:http://www.lifeofguangzhou.com)


ব্রাজিলের ইকো সিটি কুরিতিবা: দরজা আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানের জায়গাটা লক্ষ্য করুন। (ছবি: উইকিপিডিয়া)। এখানে সাধারণ বাসের মত দুইপাশে আলাদা প্লাটফর্ম।

জাকার্তা (ইন্দোনেশিয়া) (ছবি: উইকিপিডিয়া)

বোগোটা, কলম্বিয়া (ছবি:http://urbanplacesandspaces.blogspot.com ) আহা জ্যাম এড়িয়ে বাসে আগে যাওয়া যায়।


সিয়াটলে মেট্রোর মত টানেল বা সুড়ঙ্গে ট্রেন না করে বিআরটি করেছে। (ছবি উইকিপিডিয়া)

প্লাটফর্ম আর দরজা হবে এক লেভেলে এমন: (সূত্র: http://transitmy.org/)


বাস বলে কি আর ট্রেনের আমেজ পাওয়া যাবে না? ব্যবহার করুন আর্টিকুলেটেড বাস। (সূত্র:http://nexus.umn.edu/Courses/Cases/CE5212/F2008/CS3/CS3.html )


বিআরটি সিস্টেম প্রায় মেট্রো রেলের মতই। তবে এটা তৈরী করতে অত বড় কোনো আয়োজনের দরকার হয় না। তাই এটা বানাতে মেট্রোর মত অত বাজেট দরকার হয় না। পিক আওয়ার আর অফ পিক আওয়ারে প্রয়োজনমাফিক বাসের সংখ্যা কমানো বাড়ানো যায় বলে এটা অফপিক আওয়ারে মেট্রোর মত খালি যেতে হয় না। আর ট্রামের মত এটা আলাদা কোন সিস্টেম না বলে প্রচলিত লোকবল দিয়েই বাসগুলো এবং রাস্তাগুলো দেখাশোনা (মেইনটেনেন্স) করানো যায়। লাইট রেইলের চেয়েও বিআরটির খরচ কম। যুক্তরাস্ট্রের একটা সরকারী গবেষণামতে  বাসের রাস্তা বানাতে প্রতি মাইলে ১৩.৫ মিলিয়ন ডলার লাগে যেখানে লাইট রেইল লাইন বানাতে খরচ ৩৪.৮ মিলিয়ন ডলার/মাইল। তবে সাধারণ হিসাব হল: বিআরটি প্রতি মাইলে - ২লক্ষ থেকে ৫.৫ কোটি ডলার আর লাইট রেইলে সেটা ১.২৪ কোটি থেকে ১১.৮৮ কোটি ডলার। (সূত্র: উইকিপিডিয়া - http://en.wikipedia.org/wiki/Bus_rapid_transit)

বিআরটি সিস্টেমটা ট্রাফিক সমস্যার খুব ভাল সমাধান বলে বিশ্বের অনেক বড় শহরে এটা গড়ে উঠছে। কতগুলো শহরে চালু আছে সেগুলোর নাম লিখলে এই ব্লগের আকার ৩গুন হয়ে যাবে। কৌতুহলী হল উইকিপিডিয়ার লিস্টটা দেখে আসতে পারেন (http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_bus_rapid_transit_systems)।
ঢাকায় গাজীপুর থেকে উত্তরা পরীক্ষামূলক ভাবে বিআরটি করার কথা শুনেছিলাম কোন একটা টক শো তে। ওটা কি আদৌ হবে কি না কে জানে। তবে কোন দুষ্টু জানি উইকিপিডিয়ার লিস্টে বাংলাদেশের নামও ঢুকিয়ে রেখেছে!

পেপার পত্রিকা তেমন পড়া হয়না বলে এই রিপোর্টগুলো চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো:
জনকন্ঠ: ১০-জুলাই-২০১১ গাজীপুর থেকে সদরঘাট বাস পৌঁছাবে আধা ঘন্টায়
কালের কন্ঠ ২৩-জানুয়ারী-২০১০ আসছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট
অনলাইন মিডিয়া সার্ভিস: ২৫-জুন-২০১১ এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট চালু হচ্ছে
বাংলার চোখ ২৮-সেপ্টেম্বর-২০১০? রাজধানীর যানজট কমাতে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ
দেশের খবর ১১-এপ্রিল-২০১১ রাজধানীর যানজট নিরসনে নতুন উদ্যোগ বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট

পরিবেশ: ধূলাবালি দিয়ে দুষিত বায়ু


সপ্তাহখানেক আগে শিক্ষাসফরে মাওয়া যেতে হয়েছিলো। পথের মধ্যে নির্মানাধীন যাত্রাবাড়ি গুলিস্থান উড়াল রাস্তার অংশটুকু পার হতে হয়েছিল। ঐ এলাকায় বাতাস ধূলাবালি দিয়ে ভর্তি - এক অসহ্য অসভ্য অবস্থা; অথচ আমি প্রায় নিশ্চিত যে ঐ প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার সময়ে নির্মানকালে এই ধরণের বায়ু দূষণ রোধ করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে অঙ্গীকারনামা দেয়া হয়েছিল - এই ধরণের অঙ্গীকারনামা ছাড়া কোন প্রকল্পই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পায় না। একই রকম ধূলা ধুসরিত কাজ কারবার দেখা যায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের নির্মানাধীন হাতিরঝিল প্রকল্পেও। অথচ কঠোরভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলার বৈশিষ্টের অধিকারীদের (অন্ততপক্ষে সেনাবাহিনীর এমনই প্রোপাগান্ডা) কাছ থেকে এমনটা কাম্য নয়।

আমার ভাইয়েরা, মা, ভাইয়ের বউ, চাচা, ফুফু সকলেই ঢাকায় থাকে এবং ভেন্টোলিনের গ্রাহক - অর্থাৎ অ্যাজমা রোগী। অ্যাজমা রোগীর প্রশ্বাসের সাথে গলার ভেতর দিয়ে যখন ধূলিকণা ঢুকতে থাকে তখন সেটা ঠেকানোর জন্য শরীর ঐ পথ সংকুচিত করে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে; তাই শীতকালে বা ধূলাবালিতে অ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। তাই ঢাকার ধূলিধূসরিত বাতাসের বদলে অন্য কোন জায়গার (মফস্বল শহর, গ্রাম) কম ধূলিকণাযুক্ত অপেক্ষাকৃত ভাল বাতাসে তাঁদের কষ্ট কম হওয়াই স্বাভাবিক। এয়ার কন্ডিশনারে ধূলিবালি ফিল্টার হয়ে যায় বলে সেখানেও ওনারা ভাল থাকেন।

কিছুদিন আগে একটা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য দায়ী দানাদার পদার্থগুলোর শতকরা ৩০ ভাগই ইটভাটার ধোঁয়া থেকে আসে বলে দেখেছিলাম। অবশ্য সেই প্রবন্ধ প্রকাশের সময়ে যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার কিংবা হাতিরঝিল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। বর্তমানে দূষণকারী ইটভাটাগুলো বন্ধ করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে খবর পাচ্ছি, যা সামগ্রীকভাবে উপকারী হবে বলেই আশা করি। তবে অন্য উৎসগুলোও নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এবং নিজের মধ্যে সভ্য মানুষের সচেতনতা না জন্ম নিলে এই দূষণের থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এস্থান ত্যাগ করে সভ্য দেশে চলে যাওয়া ছাড়া গতি থাকবে না।

বাতাসে যে সকল সমস্যার কারণে আমরা অসুবিধায় থাকি সেগুলোকে পদার্থগুলোর ভৌত অবস্থার ভিত্তিতে মূলত: দুইভাগে ভাগ করা যায় - দানাদার (particulates) ও গ্যাস (gas)। গ্যাসীয় দূষণ চরম ক্ষতির কারণ হতে পারে। ১৯৮৪ সালে ভারতের ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার গ্যাস দূর্ঘটনার কথা নিশ্চয়ই মানুষ ভুলে নাই - এই ঘটনায় প্রায় ৪০০০ মানুষ মারা গিয়েছিলো। ঐ দূর্ঘটনায় বাতাসের চেয়ে ভারী গ্যাস মিথাইল আইসোসায়ানেট ছড়িয়ে পড়েছিলো। আমাদের বিভিন্ন কারখানায় কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানী পুড়ালে তা থেকে বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাস নির্গত হতে পারে, এই গ্যাসসমূহ বাষ্প বা অন্য কোন জলীয় অংশের সংস্পর্শে সালফিউরিক এসিড বা নাইট্রিক এসিডের মত এসিড উৎপন্ন করে। তাই তা একদিকে যেমন এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করে অন্যদিকে ওরকম গ্যাসে শ্বাস প্রশ্বাস নিলে ফুসফুসের ঝিল্লিতে প্রদাহ হয় (ভেজা কোষের সংস্পর্শে এসিড তৈরী হয় বলে)। একইভাবে দূষিত বায়ুতে মানুষের চোখ জ্বালা করা ছাড়াও অন্য অনেক রকম অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।

বায়ুদূষণে দায়ী দানাদার পদার্থগুলো কঠিন বা তরল হতে পারে। দানাদার পদার্থগুলো ধূলাবালি (dust) হতে পারে যা বড় বড় পাথর বা অন্য কঠিন পদার্থ ভেঙ্গে গুড়া গুড়া হওয়ার ফলে উৎপন্ন হয়; ধোঁয়া (smoke) হতে পারে যা কার্বনভিত্তিক বিভিন্ন জ্বালানী পুড়ানোর ফলে কারখানা, বাসাবাড়ি বা গাড়ি থেকে উৎপন্ন হতে পারে; ছাই জাতীয় পদার্থ (fly ash) হতে পারে; ফিউম (fume) বা রাসায়নিক বাষ্প ঘনীভবনে তৈরী দানা হতে পারে। এছাড়া তরল দানাদার পদার্থ হিসেবে কূয়াশার (mist) কথা বলা যেতে পারে যা পানির বাষ্প ঘনীভবনের মাধ্যমে তৈরী হয় আর দৃষ্টিসীমাকে কমিয়ে দিয়ে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে বিভিন্ন দূর্ঘটনার আশংকা বাড়িয়ে দেয়; তরল পদার্থকে বাতাসের চাপে স্প্রে (spray) আকারেও বাতাসে ছাড়া হয় বিশেষত বিভিন্ন কীটনাশক হিসেবে যা উদ্দিষ্ট কীট ছাড়াও অন্য প্রাণীদের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাতাসে দানাদার পদার্থ থাকলে তা দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দেয়। কুয়াশার কারণে বিভিন্ন সময়ে গাড়ি এবং নৌ দূর্ঘটনার খবর কিংবা যাত্রায় অতিরিক্ত সময় লাগার অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে অজানা নয়। এছাড়া ধূলিকণাগুলো চলমান যন্ত্রাংশের মধ্যে জমা হলে ঘর্ষণজনিত অতিরিক্ত ক্ষয় ও তাপ উৎপন্ন হয়ে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়। কিছুদিন আগে আইসল্যান্ডের আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে পুরা ইউরোপে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো এমন কারণেই। সোভিয়েট ইউনিয়নের চেরনবিল পারমানবিক দূর্ঘটনার ফলে ধোঁয়ার মাধ্যমে তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল।

আমাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি এবং যন্ত্রপাতির ঘর্ষণজনিত ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়া ছাড়াও দানাদার পদার্থগুলো গাছের পাতার উপর জমলে সেই পাতার সালোক সংশ্লেষণ অনেক কমে যায়, ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যহত হয়, ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এছাড়া ঐ দানাদার পদার্থের রাসায়নিক ধর্মের কারণে এটা ধারণ করা অংশে অনাকাঙ্খিত রাসায়নিক বিক্রিয়াও ঘটতে পারে। ইটভাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত এলাকায় বিভিন্ন ফলজ বৃক্ষের ফলন কমে যাওয়ার রিপোর্ট এদেশের পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে। বায়ুদূষণের ফলে পরিচ্ছন্নতার সমস্যার কথা নতুন করে বলার কিছু নাই, ঢাকায় একটা কাপড় ১ দিন ব্যবহার করে না ধুয়ে আরেকবার ব্যবহার করা যায় না অথচ জাপানে এক সপ্তাহেও শার্টের কলার বা হাতাগুলোতে ময়লা জমতো না। জামাকাপড়, পর্দা, আসবাবপত্র, বইপত্র আর জানালার গ্রীল, ঘরের মেঝে এগুলো নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখতে ধূলিময় স্থানে অনেক বেশি সময় এবং শ্রম খরচ করতে হয়।

কোন এলাকায় কতটুকু বায়ুদূষণ হচ্ছে সেটা ওখানকার আসবাবপত্রের উপর প্রতিদিন জমে থাকা ধূলাবালি খালিচোখে দেখেই সহজে অনুমান করা যায়; এক এলাকা হতে অপর এলাকার পার্থক্যও এভাবে তুলনা করা যায়। তবে বাতাসের নমুনা সংগ্রহের জন্য ল্যাবরেটরীর পদ্ধতিও আছে। তবে সেই পদ্ধতি বেশ ঝামেলাজনক -- বিশালাকার যন্ত্র গাড়িতে টেনে নিয়ে যেতে হয়, আর সেই সংগ্রাহক ফিল্টারের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট বেগে বাতাস টানতে হয় টানা ৮ ঘন্টা; ফলে সাথে জেনারেটরও নিয়ে যেতে হয়, এরপর নমুনা পরীক্ষাগারে এনে পরীক্ষা করতে হয়। বায়ুদূষণের এরকম চুলচেরা পরিমাপ করা যথেষ্ট ব্যয়বহুল এবং অচিন্তনীয়। আর এতে দীর্ঘমেয়াদী দূষণের প্রকৃতি বুঝতে চাইলে নিয়মিত এবং বিরতিহীনভাবে পরিমাপ করা দরকার। ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি জায়গায় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এমন নমুনা সংগ্রাহক চালু আছে। কোন এলাকার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উপাত্ত (বিভিন্ন বছরে নির্দিষ্ট কিছু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা, রোগী ভর্তির সংখ্যা, ঔষধ বিক্রির পরিমান ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করলেও ঐ এলাকায় বায়ু দূষণের প্রকোপ বোঝা যেতে পারে। তবে, আরেকটা বিকল্প পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হল প্রাকৃতিক নির্দেশক (ecological indicator) ব্যবহার করা। কিছু কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ ওখানকার পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনের ফলে আক্রান্ত হয় এবং সেটা দেখা যায়। যেমন কিছু মাছ আছে যারা পানির গুণগত মান সামান্য খারাপ হলেই সেই এলাকা থেকে ভেগে যায় - এই ধরণের মাছকে খাবার পানির জলাধারে রেখে জলাধারের প্রবেশ পথের আশেপাশে ওগুলোর গতিবিধি রেডার দিয়ে লক্ষ্য করা হয় (সবসময় পানি পরীক্ষা করার চেয়ে এটা অনেক কম খরচের); কখনও মাছ জলাশয়ের পানি প্রবেশ পথ থেকে পালিয়ে গেলে সাথে সাথে পরীক্ষার জন্য পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। একই ভাবে কিছু গাছ/লতাগুল্ম আছে যাদের বৃদ্ধি, পাতার আকার, রঙ ইত্যাদি বৈশিষ্ট বায়ু দূষণের সাথে সাথে প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন হয়ে যায়। ব্যাংকক শহরের বিভিন্ন জায়গায় বাতাসের গুনাগুণ পর্যবেক্ষণের জন্য এরকম কিছু গাছ লাগানো হয়েছে।

মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট দানাদার পদার্থ দিয়ে বায়ু দূষণ এর উৎসেই ঠেকানো খুব কঠিন কিছু নয়। কারখানার দানাদার কনা যুক্ত ধোঁয়াকে সরাসরি চিমনীতে আসতে না দিয়ে পানি ভর্তি একটা লম্বা হাউজের উপর দিয়ে প্রবাহিত করে তারপর চিমনীতে আসতে দিলে স্বাভাবিক অভিকর্ষ বলের কারণেই বেশিরভাগ দানাদার পদার্থ পানিতে পড়ে যাবে। পানির উপর একবার পড়ে গেলে ভেজা কনাটা অনেক ভারী হয়ে যায় বলে সেটা আবার বাতাসে ফেরৎ আসতে পারে না। ঠিক এই উপায়টা অনুসরণ করে ইদানিং বেশ কিছু ইটভাটা (২০০+) কাজ করছে বাংলাদেশে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে নতুন ইটভাটা তৈরী না করে সামান্য খরচেই (পানির হাউজ ও সংযোগকারী পাইপের জন্য) পুরাতন ইটভাটাগুলো থেকে দূষণ কমানো সম্ভব।

বিভিন্ন নির্মাণস্থলে কাঁচা রাস্তা থেকে এবং জমিয়ে রাখা নির্মাণ সামগ্রী (বালু, মাটি) বাতাসে ছড়িয়ে যেন না পড়ে সেজন্য এর প্রশমন ব্যবস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের ফরমেই দেয়া আছে (বাংলা ফর্ম, চেকবক্সে টিক দিতে হয়)। কাঁচা রাস্তা থেকে ধূলা উড়া রোধে কম গতিতে গাড়ি চালানো ছাড়াও নিয়মিত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখার উপায়টা পৃথিবীর সব সভ্য জায়গাতেই মানা হয়। এজন্য অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য পানি ব্যবহার করার প্রয়োজন নাই। অথচ পানির অভাব নাই এমন দেশেও হাতিরঝিল লেকপাড়ে কিংবা যাত্রাবাড়ির উড়াল সড়ক নির্মানস্থলে ধূলিময় নারকীয় অবস্থা ভোগ করতে হচ্ছে সকলকে। এছাড়া মাটি বা বালুর মত নির্মাণ সামগ্রী জমিয়ে রাখার স্থলের চারপাশে বায়ু প্রবাহ থেকে রক্ষার জন্য উঁচু বেড়া দিতে হয়। বালু বা মাটি পরিবহণের ট্রাকগুলোকো ত্রিপল দিয়ে ঢেকে নিতে হয়।

বাসাবাড়িতে ধূলার উপদ্রব থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে গাছপালার আবরণ একটা চমৎকার পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হতে পারে। গাছপালা সূর্যের তাপ শোষণ করে গরম থেকে রক্ষা করা ছাড়াও এর ঘন সন্নিবেশিত পাতাগুলো ধূলিকণা থিতিয়ে জমা হওয়ার জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তী বৃষ্টিতে (বা স্প্রে করে পানি দিলে) ধুয়ে নেমে যাবে। প্রতি বর্গমিটার ঝোপে এভাবে বছরে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম ধূলাবালি বায়ু থেকে দুর হতে পারে। ফলে বায়ুপ্রবাহ গাছের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর এর তাপ ও ধূলাবালি অনেক কমে যায়। প্রধাণ সড়কগুলোর মত গলিগুলোও যদি নিয়মিত ঝাড়ু দিয়ে এর মাটিগুলো সরিয়ে ফেলা হয় তাহলেও ধূলাবালির উপদ্রব অনেক কমে যাবে।

সহায়ক তথ্যসূত্র সমূহ:
প্রাকৃতিক নির্দেশক: